দীর্ঘ কয়েক বছর পর ভারতীয় রুপির বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশি টাকা। সাম্প্রতিক মুদ্রাবাজারের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, যেখানে একসময় ১০০ ভারতীয় রুপি কিনতে প্রায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১২৮ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে। একইভাবে ১০০ বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে মিলছে প্রায় ৭৭ থেকে ৭৯ ভারতীয় রুপি-যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে টাকার অন্যতম শক্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তন কেবল একটি বিনিময় হারের পরিসংখ্যান নয়; বরং এর প্রভাব পড়ছে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণ, আমদানি ব্যয় এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয়ের উন্নতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির কারণে টাকার ওপর চাপ কমেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দুর্বলতাও এই অবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।
সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন যারা
চিকিৎসা-পর্যটনে বড় স্বস্তি: ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, ভেলোর, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীদের ব্যয় এখন আগের তুলনায় কমে এসেছে। হাসপাতাল ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, আবাসন ও স্থানীয় যাতায়াত-সব ক্ষেত্রেই খরচ হ্রাস পাচ্ছে।
একজন রোগী যদি ২ লাখ রুপি চিকিৎসা ব্যয় করেন, আগের তুলনায় এখন কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমছে।
পর্যটনে খরচ কমেছে: ভারত বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। কলকাতা, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, কাশ্মির, দিল্লি, আগ্রা ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রতিবছর লাখো বাংলাদেশি ভ্রমণ করেন।
রুপির বিপরীতে টাকার মান বাড়ায় একই টাকায় এখন আগের তুলনায় বেশি রুপি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে হোটেল, খাবার, কেনাকাটা ও পরিবহন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভারত ভ্রমণে আগ্রহ আরো বাড়তে পারে।
শিক্ষার্থীদের ব্যয় কিছুটা কমেছে: ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় রুপিতে পরিশোধ করতে হয়। ফলে রুপির মূল্য কমে যাওয়ায় তাদের মোট ব্যয় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, যা পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তির খবর।
আমদানি ব্যবসায় সুবিধা: বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশ আসে ভারত থেকে-তুলা, সুতা, ভোগ্যপণ্য, পেঁয়াজ, মসলা, রাসায়নিক ও শিল্প কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য।
রুপির বিপরীতে টাকার শক্তিশালী অবস্থানে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে এখন কম টাকা ব্যয় হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের খরচ কমে মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। বেনাপোল, ভোমরা, হিলি ও আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সীমান্ত অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব: যশোর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে। ভারতীয় পণ্যের লেনদেন সহজ ও সস্তা হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায় নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে।
সাধারণ ভোক্তা কি লাভবান হবেন: বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সুবিধা ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। কারণ আমদানি ব্যয় কমলে কিছু পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এর জন্য পরিবহন ব্যয়, শুল্ক, বাজার ব্যবস্থাপনা ও ডলারের বিনিময় হারসহ অন্যান্য বিষয়ও সহায়ক হতে হবে।
কেন শক্তিশালী হলো টাকা: অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকটি প্রধান কারণে বাংলাদেশি টাকার অবস্থান উন্নত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-
* প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ বৃদ্ধি
* রফতানি আয়ের উন্নতি
* বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির কিছুটা স্থিতিশীলতা
* বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার প্রভাব
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির কিছুটা দুর্বলতাও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা: অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখতে হলে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় আরো বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
তাদের মতে, বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছেন চিকিৎসা ও ভ্রমণকারী, আমদানিকারক ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মানুষ। সূত্র: প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও বাজার পর্যবেক্ষণ
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৯/৬/২০২৬