পবিত্র ঈদুল আজহার আগের দিন রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে সাধারণত উপচে পড়া ভিড় আর জমজমাট বেচাকেনার দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু এবার শেষ দিনে ঢাকার গাবতলী, উত্তরা দিয়াবাড়ি, কমলাপুর ও উত্তর শাহজাহানপুরের হাটগুলোতে ছিল ভিন্ন চিত্র। টানা বৃষ্টি, কাদাপানি, ক্রেতা সংকট এবং বড় গরুর কম চাহিদায় হতাশ হয়ে পড়েছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কম দামে পশু কিনতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক ক্রেতা।
বৃষ্টিতে থমকে গেল শেষ দিনের বাজার
বুধবার (২৮ মে) দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির কারণে হাটের ভেতরে হাঁটাচলাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও পানি জমে থাকায় অনেক ক্রেতাই মূল হাটে ঢুকতে চাননি। ফলে নির্ধারিত প্যান্ডেল ছেড়ে রাস্তার পাশে, মাছের আড়ৎ এলাকায় কিংবা বেঁড়িবাঁধের ধারে গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে অসংখ্য ব্যবসায়ীকে।
ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে চলছিল ডাকাডাকি—
“আর একটা গরু আছে, দেখে যান”,
“কেনা দামেই ছেড়ে দেব”,
“কম দামে নিয়ে যান”—এমন আহ্বান ছিল চারদিকে।
হাটজুড়ে গরুর সরবরাহ ছিল পর্যাপ্ত, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা ছিল কম। বিশেষ করে ঈদের আগের রাতেও গাবতলী ও কমলাপুরের মতো বড় হাটে অনেক গরু অবিক্রীত পড়ে থাকতে দেখা যায়।
‘কেনা দামেও বিক্রি করতে পারছি না’
খামারি ও পাইকারদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে বাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কয়েক দিন আগেও যে গরুর দাম দুই লাখ টাকা বলা হচ্ছিল, শেষ দিনে সেটির দাম নেমে এসেছে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়।
ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে ১৫০টি গরু নিয়ে উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটে আসা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম রবি জানান, এখনো তাঁর ৩০টি গরু অবিক্রীত রয়েছে। তিনি বলেন,
“কোনোটা দুই-এক হাজার লাভে বিক্রি করছি, কোনোটা কেনা দামে। সব মিলাইয়া লসে আছি।”
তিনি একটি গরুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন,
“এই গরুটা ৬৫ হাজার টাকায় কেনা। কিন্তু ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি বলতেছে না।”
কমলাপুর পশুর হাটে চুয়াডাঙ্গা থেকে ৮০টি গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামও একই হতাশার কথা বলেন। তাঁর ভাষায়,
“যে গরুর কেনা দামই দুই লাখ টাকা, সেই গরু এখন মানুষ দাম বলছে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। এত কম দামে বিক্রি করার চেয়ে গরু ফিরিয়ে নেওয়াই ভালো।”
অনেক ব্যবসায়ী জানান, তারা রাতেই ট্রাক ডেকে অবিক্রীত পশু গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগের বড় অংশই এবার লোকসানে যাবে।
বড় গরুর বাজারে ধস
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বড় গরু ও মহিষের ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বিভিন্ন হাটে বাহারি নামের বিশালাকৃতির গরুগুলোর অধিকাংশই শেষ সময় পর্যন্ত অবিক্রীত ছিল।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর থেকে আনা প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি ওজনের “টাঙ্গাইলের মান্না” নামের গরুর দাম চাওয়া হয়েছিল ১২ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা সাড়ে ৮ লাখ টাকার বেশি বলেননি।
একইভাবে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে আনা “বাদশা” নামের প্রায় ১ হাজার ২১৯ কেজি ওজনের গরুর জন্য ১২ লাখ টাকা চাওয়া হলেও দাম উঠেছে সাড়ে সাত লাখ টাকার মতো। সঙ্গে “মহারাজ” নামের একটি খাসি ফ্রি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন খামারি।
গাবতলী হাটে ৪০ মণ ওজনের “সম্রাট বাবু” নামের গরুটি প্রথমে ৩২ লাখ টাকা চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।
খামারিদের ভাষ্য, এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা থাকলেও বড় গরুর ক্রেতা প্রায় নেই বললেই চলে।
মহিষের ক্রেতাও মিলছে না
শুধু বড় গরু নয়, মহিষের বাজারেও দেখা গেছে চরম মন্দা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিনটি মহিষ নিয়ে আসা খামারি মো. সুমন বলেন,
“তিন দিন ধরে হাটে বসে আছি। হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা আসছে। অর্ধেক দামাদামি করছে, বাকিরা দাম না শুনেই চলে যাচ্ছে।”
মানিকগঞ্জের আরেক খামারি মো. মারুফ জানান, তাঁর মহিষের আকার অনুযায়ী দাম পাঁচ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা, কিন্তু ক্রেতারা চার লাখ টাকার বেশি বলছেন না।
‘ঘুরাই নেওন নাগবই’
হাটজুড়ে হতাশার সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে ওঠে অবিক্রীত পশু ফেরত নেওয়ার আলোচনা। উত্তর শাহজাহানপুর ও গাবতলী হাটে অনেক ব্যবসায়ীকে বলতে শোনা যায়—
“গরু যদি ঘুরাই নেন, তাইলে খবর কইয়েন।”
“ঘুরাই তো নেওন নাগবই।”
অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, আগে বেশি লাভের আশায় গরু বিক্রি করেননি, এখন সেই সিদ্ধান্তই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কৃষক মামুন বলেন,
“দুই দিন আগে এই গরুর দাম উঠেছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা। বিক্রি না করে ভুল করেছি। এখন বাড়ি নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
ক্রেতাদের মুখে স্বস্তি
যেখানে বিক্রেতাদের মধ্যে হতাশা, সেখানে অনেক ক্রেতার মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। কারণ শেষ সময়ে এসে গরুর দাম তুলনামূলক কমে যায়।
উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম প্রায় ৬ মণ ওজনের একটি গরু কিনেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। তিনি বলেন,
“গতকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল বাজেট অনুযায়ী এবার হয়তো পছন্দের গরু কোরবানি দিতে পারব না। কিন্তু আজ হাটের পরিস্থিতি বদলেছে।”
গাবতলীতে আসা অনেক ক্রেতাও বলেন, এবার হাটে কোনো অতিরিক্ত চাপ বা অস্বাভাবিক মূল্য ছিল না। বরং শেষ সময়ে দরদাম করে স্বাভাবিক দামে পশু কেনা গেছে।
কেন এমন পরিস্থিতি
খামারি, ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ বছরের বাজার পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে—
* ঈদের আগের টানা বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া
* মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া
* উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ
* বাজারে অতিরিক্ত পশুর সরবরাহ
* বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বৃদ্ধি
তাদের মতে, এসব কারণে শেষ সময়ে এসে বাজারে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। ফলে ক্রেতারা সুবিধা পেলেও বিপুল সংখ্যক খামারি ও ব্যবসায়ী লোকসানের মুখে পড়েছেন।
হতাশা নিয়েই শেষ হলো এবারের হাট
ঈদের আগের রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর হাটগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—
একদিকে কম দামে কোরবানির পশু কিনে সন্তুষ্ট ক্রেতা, অন্যদিকে বছরের সঞ্চয় আর পরিশ্রম হারানোর শঙ্কায় চোখ মুছছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা।
অনেকেই বলছিলেন,
“এমন খারাপ বাজার বহু বছরেও দেখিনি।”
কারও কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস—
“গরু আছে, কিন্তু ক্রেতা নেই।”
সানা/আপ্র/২৮/৫/২০২৬