বাগেরহাট শহরের ঐতিহ্যবাহী গাজী কালু সাহেবের দরগাহ-সংলগ্ন সরকারি খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দখলের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত, বিতর্কিত রেকর্ড বাতিল এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন দরগাহের খাদেম, ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, জমিটি তারা বৈধভাবে ক্রয় করেছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) সকাল ১১টায় বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সামনে ‘ভূমিদস্যুদের কবল থেকে সরকারি খাস খতিয়ানের জমি উদ্ধার ও ঐতিহ্যবাহী গাজী কালুর দরগা সংরক্ষণ’ শীর্ষক ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দরগাহের খাদেম, ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনের আগে দরগাহের বর্তমান খাদেম জামাল হাওলাদার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তার বাবা মরহুম ইউসুফ হাওলাদার দীর্ঘদিন দরগাহের খাদেম ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনিই দরগাহটির দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, বাগেরহাট সদর উপজেলার ১৫৬ নম্বর সরুই মৌজার সিএস ৭৯৭ ও এসএ ৭০১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির মূল মালিক দেশত্যাগ করার পর জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১০০৮ নম্বর দাগে দরগাহ এবং ১০১০, ১০১২, ১০১৪, ১০২১, ১০৩১ ও ১০৩৪ নম্বর দাগের জমি দীর্ঘদিন ধরে দরগাহ, মসজিদ, খাদেমের বসতঘর, খানকাহ ও যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া ১০৪০ নম্বর দাগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক ও খাদেমের দখল-দায়িত্ব রেকর্ডভুক্ত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করিয়ে বর্তমানে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার মেলেনি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গাজী কালুর দরগা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি বাগেরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন, বিতর্কিত রেকর্ড বাতিল এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মো. কামরুল শেখ, মহারাজ শেখ ও দরগাহের খাদেম জামাল হাওলাদার।
মো. কামরুল শেখ বলেন, যদি জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে কীভাবে তা ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হলো-এ প্রশ্নের জবাব মিলতে হবে। তিনি জমিটি সংরক্ষণ এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ কামনা করেন।
মহারাজ শেখ বলেন, সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হওয়ার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
দরগাহের খাদেম জামাল হাওলাদার অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে প্রভাব খাটিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি সরকারি খাস জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ডা. সিরাজুল হক, শ্যামল কুমার নাগ, বিজয় কৃষ্ণ হালদার, শেখ আছাদুল ইসলাম ও শেখ হাসানুল ইসলাম প্রভাব খাটিয়ে সরকারি জমি নিজেদের দখলে নিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. সিরাজুল হক বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে তারা নারায়ণ নাগের কাছ থেকে বৈধভাবে জমিটি কিনেছেন। জমির বৈধ দলিলসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও কোথাও তা প্রমাণিত হয়নি। এ বিষয়ে আগামী ২২ জুলাই আদালতে মামলার শুনানির তারিখ রয়েছে।
অপর অভিযুক্ত শেখ শামসুল উদ্দিন বলেন, এটি ব্রিটিশ আমলের সম্পত্তি। বৈধ দলিলের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা আইনসম্মতভাবে জমি ভোগদখল করে আসছেন। তাই সরকারি খাস জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়।
সানা/আপ্র/১৯/৭/২০২৬