পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি করতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শহরে এসেছিলেন বাবা সুজন মিয়া। দুই সন্তানের জন্য কিনেছিলেন নতুন জামা-কাপড়। ঈদের আগের সন্ধ্যায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর সেই যাত্রাই মুহূর্তে পরিণত হলো আজীবনের শোকে। নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন এক মা ও তার ১৮ মাস বয়সী শিশু সন্তান। কাকতালীয়ভাবে বেঁচে গেছে পরিবারের নয় বছরের আরেক সন্তান।
বুধবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। নিহতরা হলেন শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং তাদের ছোট ছেলে সাফওয়ান ওরফে হাসেন।
স্বজনদের বরাতে রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, জীবিকার তাগিদে কখনও ইজিবাইক চালক, আবার কখনও রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন সুজন মিয়া। সীমিত আয়ের মধ্যেও ঈদকে ঘিরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বিকেলে নরসিংদী শহরে এসেছিলেন কেনাকাটা করতে।
দুই সন্তানের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে বাড়ি ফিরছিল পরিবারটি। সন্ধ্যার দিকে তারা নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়।
স্টেশনের এক নম্বর লাইনে তখন একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। সাথী বেগম তার ১৮ মাস বয়সী ছেলে সাফওয়ান এবং নয় বছরের মেয়ে সামিয়াকে নিয়ে পাশের আরেকটি লাইনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সুজন মিয়া স্টেশন থেকে কিছু আনতে সামান্য দূরে গিয়েছিলেন।
ঠিক তখনই ঢাকাগামী “কক্সবাজার এক্সপ্রেস” দ্রুতগতিতে স্টেশন অতিক্রম করছিল। পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগেই ট্রেনটির ধাক্কায় মা ও ছেলে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাথী বেগম ও তার শিশু ছেলে সাফওয়ান। তবে একই লাইনে থাকা নয় বছরের সামিয়া অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যায়।
দুর্ঘটনার পর স্ত্রী ও সন্তানকে দ্রুত নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান সুজন মিয়া। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মা ও ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্ত্রী ও সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সুজন মিয়া।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন,
“আমার সামনে আমার অবুঝ শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে হারিয়েছি। তাদের জন্য নতুন জামা কিনে আর বাড়ি ফিরতে পারিনি। আগামীকাল ঈদ আমি কাদের নিয়ে করব।”
তিনি জানান, ট্রেন আসতে দেখে স্ত্রীকে সরতে চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়।
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশের এসআই দিলীপ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঈদের আনন্দের ঠিক আগমুহূর্তে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। নতুন জামা-কাপড় হাতে নিয়ে যে পরিবার ঘরে ফেরার কথা ছিল, সেই পরিবার এখন ফিরছে লাশ নিয়ে—একটি উৎসবের আগের রাতে যা হয়ে উঠেছে এক অসহনীয় ট্র্যাজেডি।
সানা/আপ্র/২৮/৫/২০২৬