গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। উপজেলার অন্তত ১৪০টি স্পটে সক্রিয় রয়েছে মাদক কারবারিদের একটি শক্তিশালী চক্র। মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন ৯ জন পুলিশ সদস্য। মাদক সেবন ও কারবার সংক্রান্ত পৃথক ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ জন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক নারী। নেশার টাকার জন্য বাবার হাত ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকাতেও পৌঁছে গেছে মাদকের বিস্তার। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা ও চোলাই মদ। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে এই মাদক ব্যবসায়। এতে ধ্বংসের পথে যাচ্ছে শ্রীপুরের যুবসমাজ।
মাদকের মাত্রাতিরিক্ত বিস্তার হওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক ক্ষেত্রে তারা মাদক কারবারিদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করছে। সম্প্রতি স্থানীয় জনতা মাদক কারবারিদের অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে।
পুলিশ জানায়, শ্রীপুরে মাদক সমস্যা নতুন নয়। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসব ঘটনাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নও বলা যাচ্ছে না।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল শ্রীপুর উপজেলায় বিভিন্ন জেলার লাখ লাখ মানুষের বসবাস। কর্মসংস্থানের আড়ালে অনেক নারী-পুরুষ মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর রাতে কেওয়া পশ্চিম খণ্ড গ্রামে মাদকবিরোধী অভিযানে গেলে হামলায় ৫ পুলিশ সদস্য আহত হন। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ৩১ ডিসেম্বর রাতে মাওনা পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশে, যেখানে মাদক কারবারিদের হামলায় আহত হন আরও ৪ পুলিশ সদস্য।
গত ১ মার্চ বরমী মধ্যপাড়া গ্রামের ডুলিপাড়া এলাকায় মাদক কারবারিদের হামলায় নিহত হন আকরাম হোসেন। ৬ মার্চ সন্ধ্যায় মূলাইদ গ্রামের এমসি বাজার এলাকায় মাদক কারবারিদের গুলিতে আহত হন মনোয়ারা বেগম। ৮ মার্চ রাতে হায়াৎখারচালা গ্রামে নেশার টাকার জন্য বৃদ্ধ বাবার হাত ভেঙে দেয় তার ছেলে রাসেল।
এছাড়া ৩ মার্চ গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় নেশার টাকার জন্য রেজাউল করিম (৪০) খুন হন। গত বছরের ৬ আগস্ট বরমী গ্রামের মৃধাপাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করেন নুরুল ইসলাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হচ্ছে। সন্ধ্যা নামলেই বেড়ে যায় মাদকচক্রের তৎপরতা। নির্জন সড়ক ও বিভিন্ন সেতুর আশপাশে মাদক কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি স্থানীয় জনতা বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ১০-১৫ জন মাদক কারবারিকে ধরে পুলিশে দিয়েছে। ৮ মার্চ রাতে বরমী মধ্যপাড়া গ্রামের ডুলিপাড়া এলাকা থেকে ২২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ সালাউদ্দিন টুটুল (৪২) ও রিনি আক্তার (৩০) নামের দুইজনকে আটক করে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।
১১ মার্চ রাতে বাঁশবাড়ি গ্রামে কবির ও আনোয়ার নামে দুই মাদক কারবারিকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। ১২ মার্চ দুপুরে মূলাইদ গ্রামে স্থানীয়রা হামলা চালিয়ে মাদক কারবারিদের ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। ১৩ মার্চ দুপুরে রাজাবাড়ী ইউনিয়নের এসিআই গেট এলাকা থেকে মাদকসহ হিরণ নামের এক ব্যক্তিকে ধরে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী।
সচেতন মহলের দাবি, মাদকের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধ বাড়ছে। উঠতি বয়সের যুবক-যুবতী ও শিক্ষার্থীরা মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির আহমেদ বলেন, ‘শ্রীপুরে মাদক নতুন কোনো বিষয় নয়। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রচুর মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। স্থানীয়রাও সহযোগিতা করছে। মোটরসাইকেল ভাঙচুরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোরালো অভিযান চালাচ্ছি।’
কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি মাদক তৎপরতা কিছুটা বেড়েছে বলে তথ্য পাচ্ছি। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. এমদাদুল হক মিঠুন বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমাদের কাজ করতে হয়। তথ্য পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সানা/আপ্র/১৪/৩/২০২৬