গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

মেনু

শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পরও নারীরা অসহায়-নিপীড়িত-নির্যাতিত

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:১১ পিএম, ২২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫৯ এএম ২০২৬
শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পরও নারীরা অসহায়-নিপীড়িত-নির্যাতিত
ছবি

ছবি সংগৃহীত

নারী আজও শিকল ছিঁড়ে বের হতে পারেননি। শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পরও নারীরা অসহায়-নিপীড়িত-নির্যাতিত। নারীর নিজস্ব অভিরুচি সমাজের প্রচলিত সংস্কার-কুসংস্কার বা প্রথার কাছে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। নারী হয়ে পড়েন অসহায়। পুরুষতন্ত্রের ধারক-বাহক এ সমাজে একশ্রেণির নারীও সর্বদা মন এবং মগজে ধারণ ও লালন করে স্ত্রীর ওপর স্বামীর কল্যাণ নিহিত। তাই স্বামীর কল্যাণকামনায় স্ত্রীকে তথা নারীকে নানা রকম ত্যাগের মধ্যে দিয়ে জীবনকে প্রতিপালন করতে হবে। বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যদি নারী তার জীবনাচরণে পরিবর্তন না আনেন, তাহলে তাকে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে হয়। বলা চলে নারীকে কৈফিয়ত দিতে হয়। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার

নারী হয়ে পড়েন কোনো বিশেষ ব্যক্তির গচ্ছিত আমানত। আর এই আমানতের ফলস্বরূপ নারী কিন্তু তার সবটাকে বিসর্জন দেওয়ার চেষ্টা করলেও পুরুষ সেক্ষেত্রে নির্বিকার। তার বা এই গোষ্ঠীর জীবনাচরণে কোনোই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে তার যত অভ্যেস তিনি ঠিক ততটাই আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করেন। আবার তেমনই অনেক স্বাধীনচেতা পুরুষ নারীর ওপর ছেড়ে দেন যে, তাকে ভালো না লাগলে  সঙ্গে না থাকুক কিন্তু তিনি তার কোনো অভ্যেসই ছাড়তে নারাজ। একইসঙ্গে যৌক্তিক প্রশ্ন থেকেই যায় তাহলে এই শ্রেণি কি স্ত্রী বা নারীর সব চাওয়া বা তার অভ্যসে বাধা দেন? বেশিরভাগেরই উত্তর আসবে হ্যাঁ । তারা নিজেরা অর্থাৎ পুরুষ নিজে না পাল্টালেও নারীকে অবশ্যই পরিবর্তন হতে হবে। কারণ সে কারো বউ, বউমা, ভাবি, মামি, কাকি, চাচি, পিসি, মাসি ইত্যাকার সম্পর্কে জড়িত। ফলে নারীর মধ্যে পূর্বের উচ্ছলতা, প্রাণবন্ততা, হাসি, মজার ক্ষেত্রে রেশ টানতে হয়। সর্বোপরি জীবনের পুরো ভূগোলটাই পরিবর্তন করতে হয়। কখনো চাপে পড়ে কখনো সংস্কার, প্রথা, কুসংস্কারের প্রেক্ষিতে।

নারী মানেই এক অবরুদ্ধ, অবহেলিত,  নির্যাতিত,  নিপীড়িত পোষ মানা প্রাণী। যার নিজের কোনোই অস্তিত্ব থাকতে নেই। পিতা-ভাই-স্বামী-সন্তানের কাছে অবলা নির্জীব প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো কোন এক পুতুল সদৃশ। তাই নারীকে ইচ্ছে মতো সাজানো যায়, শাসন-শোষণ করা যায়।

নারীবিদ্বেষ হলো নারীদের প্রতি ঘৃণা, অবমূল্যায়ন বা তীব্র বিরাগ。ইতিহাসের প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য এর প্রধান শিকড়। আধুনিক যুগে এই বিদ্বেষ পুরোনো রূপ পরিবর্তন করে আরও সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তি-নির্ভর রূপ লাভ করেছে- যা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে।

একটি মেয়ে যখন কঠোর পরিশ্রমে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অর্জনকে পাশ কাটিয়ে মন্তব্য ভেসে আসে- ‘কারো সুপারিশে পেয়েছে নিশ্চয়ই!’ কিংবা ‘সংসার সামলানো ছেড়ে মেয়েদের এত বাড়াবাড়ি কেন?’ প্রশ্ন হলো, এই আক্রোশ বা নেতিবাচক মনোভাবের কারণ কী? এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মুহূর্তের ক্ষোভ নয়; সমাজব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যধি- যার নাম নারীবিদ্বেষ। ইতিহাসের নানা বাকবদল, শিক্ষার প্রসার কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি- কোনো কিছুই যেন এই মানসিকতাকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। উল্টো আধুনিক যুগে এসে নারীবিদ্বেষ ধারণ করেছে নতুন রূপ।

নারীবিদ্বেষ কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?সাধারণ অর্থে নারীবিদ্বেষ বা ‘মিসোজিনি’ বলতে নারীর প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ বা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণকে বোঝায়। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল ‘ঘৃণা’তেই সীমাবদ্ধ নয়; মূলত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর একটি প্রয়োগকারী মাধ্যম। যখনই কোনো নারী প্রচলিত সামাজিক ছক বা পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের জায়গা তৈরি করতে চান, তখনই নারীবিদ্বেষী মানসিকতা তাকে দমিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

লিঙ্গবৈষম্য ও নারীবিদ্বেষের পার্থক্যলিঙ্গ বৈষম্য: কোনো লিঙ্গকে অন্য লিঙ্গের চেয়ে কম সক্ষম মনে করা বা নির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণ করে দেওয়া (যেমন- মেয়েরা রাজনীতি বোঝে না)।

নারীবিদ্বেষ: ওই যে নির্ধারণ করে দেওয়া সীমানা কোনো নারী ভাঙতে গেলে তাকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা (যেমন- ট্রোলিং, চরিত্রহনন বা সহিংসতা)।

আধুনিক বিশ্বে নারীবিদ্বেষের নতুন চেহারা: অতীতে নারীবিদ্বেষের প্রকাশ ঘটত মূলত চার দেয়ালের ভেতর বা কর্মক্ষেত্রে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এর পরিধি বিস্তৃতি লাভ করেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।

সাইবার বুলিং ও ট্রোলিং: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশকারী বা সফল নারীদের লক্ষ্য করে চরিত্রহনন, কটূক্তি এবং ‘স্লাট-শেমিং’ করা নিত্যদিনের ঘটনা।

ভিকটিম ব্লেমিং: নারী নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হলে অপরাধীকে ছাড় দিয়ে উল্টো নারীর পোশাক, সময় ও চলাফেরাকে দায়ী করার প্রবণতা।

ডিজিটাল কন্টেন্টের প্রভাব: ইন্টারনেটে ছড়ানো কিছু তথাকথিত ‘আলফা মেল’ বা পুরুষতান্ত্রিক কন্টেন্ট তরুণদের মধ্যে নতুন করে নারীবিদ্বেষকে স্বাভাবিক বলে শেখাচ্ছে।

নারীবিদ্বেষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক শিকড়: কেন সমাজ বা ব্যক্তির মধ্যে নারীবিদ্বেষ তৈরি হয়? এর পেছনে কাজ করে বেশ কিছু গভীরে থাকা কারণ। তা হলো-

ক্ষমতা হারানোর ভয়: শত শত বছর ধরে পুরুষ যে একচ্ছত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকার উপভোগ করে আসছে, নারীর অগ্রগতির ফলে সেখানে অংশীদারিত্বের ভয় তৈরি হয়।

শৈশবের সামাজিকীকরণ: ছোটবেলা থেকে পরিবার ও সমাজ থেকে শেখানো দৃষ্টিভঙ্গি- যেখানে পুরুষকে কর্তৃত্বশীল এবং নারীকে অনুগত হিসেবে দেখতে শেখানো হয়।

পারিবারিক ও মানসিক গঠন: অনেক সময় শৈশবে দেখা পারিবারিক সহিংসতা বা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নারীবিদ্বেষী মনোভাব উসকে দেয়।

সমাজ ও নারীর ওপর প্রভাব: নারীবিদ্বেষ কেবল ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যা নয়, সামগ্রিক সমাজের অগ্রগতির প্রধান বাধা। ক্ষেত্রপ্রভাবমানসিক স্বাস্থ্যক্রমাগত হেয় হওয়া এবং কটূক্তির শিকার হওয়ায় নারীদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়- যা বিষণ্নতা ও উদ্বেগ তৈরি করে।

স্বাধীনতার সংকোচন: ভীতি ও নিরাপত্তার অভাবে নারীরা পাবলিক স্পেস, কর্মক্ষেত্র এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ সংকুচিত করতে বাধ্য হয়।

সহিংসতা বৃদ্ধি: নারীবিদ্বেষী মানসিকতা দিনশেষে পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধকে উসকে দেয়।

উত্তরণের পথ: নারীবিদ্বেষের মতো গভীরে থাকা সামাজিক ব্যাধি রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত পদক্ষেপে কিছু মনোভাব পরিবর্তন করা সম্ভব। তা হলো-

শিক্ষা ও সচেতনতা: একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লিঙ্গসমতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে হবে।

কঠোর আইন ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পুরুষের অংশগ্রহণ: নারীবিদ্বেষ প্রতিরোধে পুরুষদেরই সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা নিতে হবে। নিজেদের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে চিহ্নিত করে বদলে ফেলাই এর মূল চাবিকাঠি।

পরিশেষে বলা যায়, নারীবিদ্বেষ কোনো নারীর একার সমস্যা নয়, এটি মানবিক সমাজ গঠনের পথের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। কোনো সমাজ অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে হেয় করে বা তাদের অধিকার আটকে রেখে এগিয়ে যেতে পারে না। একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন চিন্তার মুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।

কেএমএএ/আপ্র/২২.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুর সুরক্ষা ছড়িয়েছে গৃহ-সমাজ থেকে ইন্টারনেট পর্যন্ত
২২ জুলাই ২০২৬

শিশুর সুরক্ষা ছড়িয়েছে গৃহ-সমাজ থেকে ইন্টারনেট পর্যন্ত

শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু তাদের এই ছোট ও সুন্দর জগৎটিকে নিরাপদ রাখা দিন দিন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হ...

একদিনের ছুটিতে ঘোরার জন্য ঢাকার পাশেই আছে কিছু স্থান
২২ জুলাই ২০২৬

একদিনের ছুটিতে ঘোরার জন্য ঢাকার পাশেই আছে কিছু স্থান

ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি মেটাতে সপ্তাহান্তে বা একদিনের ছুটিতে ঢাকার আশপাশ থেকেই ঘুরে আসা যায় চমৎকার...

আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের সাজিয়া
২২ জুলাই ২০২৬

আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের সাজিয়া

ভোর হতে না হতেই শুরু হয় সাজিয়া সুলতানার নতুন দিনের লড়াই। একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান...

কন্যাশিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে বাল্যবিয়ে ও ইভ টিজিং
২২ জুলাই ২০২৬

কন্যাশিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে বাল্যবিয়ে ও ইভ টিজিং

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি পরিবারের দায়িত্ব নয়; একটি সুস্থ, সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

জামায়াত এমপির বিয়ে নিয়ে বিতর্ক, বায়োডাটায় নতুন প্রশ্ন

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্য দাবি করেছেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে তাঁর দাবিকৃত বিয়ের পাঁচ দিন পর স্বাক্ষর করা একটি বায়োডাটায় ওই তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন যে, এমপির দাবি ন্যায়সঙ্গত?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 5 ঘন্টা আগে