বিশ্বজুড়ে শিশুদের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ সংক্রমণও শিশুদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
অস্ট্রেলিয়ার মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ইউনিভার্সিটি অব সিডনির যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশ্বের ৮২টি দেশের ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সী ১ লাখ ৬ হাজার ৫৮১ শিশুর সংক্রমণের নমুনা বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই প্রবণতা আগামী এক দশকে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এর ফলে এমন সংক্রমণও চিকিৎসার বাইরে চলে যেতে পারে, যা বর্তমানে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা নবজাতক ও শিশুরা এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাসম্পন্ন দেশের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণার সহ-লেখক ও মারডক চিলড্রেনস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. পেনেলোপি ব্রায়ান্ট বলেন, সেপসিস ও নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর সংক্রমণ শিশুদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি জানান, শুধু গুরুতর রোগ নয়, শিশুদের সাধারণ মূত্রনালীর সংক্রমণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর থাকছে না। ফলে চিকিৎসকদের জন্য রোগ নিরাময়ে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাসিনেটোব্যাকটেরিয়া বাউমানি নামের একটি ব্যাকটেরিয়া শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শক্তিশালী দ্বিস্তরীয় আবরণযুক্ত এই ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি।
এ ছাড়া মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যকৃতে পুঁজ জমার মতো সমস্যার জন্য দায়ী ক্লেবসিলা ব্যাকটেরিয়াও দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
গবেষণায় পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। ওই সময় অ্যাসিনেটোব্যাকটেরিয়া বাউমানির ক্ষেত্রে এই হার ৮২ শতাংশ এবং ক্লেবসিলার ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ড. ব্রায়ান্ট বলেন, বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখন অন্যতম বড় হুমকি। কিন্তু শিশুদের নিয়ে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ও নজরদারি হয়নি।
তিনি বলেন, শিশুদের ওপর চিকিৎসাগত পরীক্ষা বা ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের গবেষণা চালাতে অনেক ক্ষেত্রেই অনীহা দেখা যায়। পাশাপাশি শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ওষুধ তৈরি করা ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক হওয়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধ উন্নয়নেও ঘাটতি রয়েছে।
গবেষকদের মতে, শিশুরা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হয়। কিন্তু তাদের জন্য অনুমোদিত ও নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা বড়দের তুলনায় অনেক কম। ফলে শিশুদের চিকিৎসা আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া কোন ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করছে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষকরা ‘এএমআর ইন কিডস’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। এতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত অঞ্চল ও ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক সম্ভাব্য ঝুঁকির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান সোসাইটি ফর ইনফেকশাস ডিজিজেসের সভাপতি ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্রিস ব্লাইথ বলেন, এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সংকটের ব্যাপকতা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য স্পষ্ট করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। এসব দেশে সঠিক রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিক নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে কৃষি, গবাদিপশু চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিককে তিনটি ভাগে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ‘অ্যাক্সেস’ শ্রেণির ওষুধ সাধারণ চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়, ‘ওয়াচ’ শ্রেণির ওষুধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি বেশি এবং ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির ওষুধ সবচেয়ে জটিল ও প্রতিরোধী সংক্রমণের শেষ ভরসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অধ্যাপক ক্রিস ব্লাইথ সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে এমন অনেক শিশুর চিকিৎসা করতে হচ্ছে, যাদের সংক্রমণ প্রথম ও দ্বিতীয় সারির ওষুধে ভালো হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে এমন শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সংগ্রহ করা কঠিন, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
গবেষকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রক্ষা করতে হলে এখনই এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী নজরদারি জোরদার করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও শিশুদের জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২২/৭/২০২৬