বাতাসে উড়ছে একটি প্রজাপতি। হঠাৎ সেটিকে ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিকারি পাখি। কিন্তু পাখিটির চোখে তখন প্রজাপতিটির যে গতিপথ ধরা পড়ছে, বাস্তবে সেটি তেমন নয়। ডানার বিশেষ নকশা ও ঝাপটানোর ভঙ্গির কারণে তৈরি হওয়া এক ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম শিকারিকে প্রজাপতির প্রকৃত গতি ও দিক সম্পর্কে বিভ্রান্ত করে। শিকারি সেই বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠার আগেই প্রজাপতিটি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
প্রকৃতির এই আত্মরক্ষার কৌশল নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রজাপতির ডানার বৈপরীত্যপূর্ণ নকশা ও ডানার নড়াচড়া একসঙ্গে মিলে এমন এক ধরনের বিভ্রান্তিকর গতির সংকেত তৈরি করে, যা শিকারির পক্ষে উড়ন্ত প্রজাপতির সঠিক গতি ও দিক নির্ধারণ কঠিন করে তোলে।
ইংল্যান্ডের এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটির অন্যতম প্রধান গবেষক জোলিয়ান ট্রোসকিয়ানকো বলেন, প্রজাপতির ডানার নকশা ও ঝাপটানোর গতি একসঙ্গে এমন দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করে, যার ফলে প্রজাপতিটিকে তার প্রকৃত গতিপথের চেয়ে অন্য দিকে ছুটছে বলে মনে হয়। একটি পাখি যখন প্রজাপতিকে ধরার জন্য আক্রমণ করে, ঠিক সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তে এই দৃষ্টিবিভ্রমই প্রজাপতির জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
ডোরাকাটা বা গাঢ় দাগের মাধ্যমে ‘মোশন ড্যাজল’ বা গতির বিভ্রান্তি তৈরির ধারণা বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন নয়। তবে জেব্রা, সাপ ও টিকটিকির মতো প্রাণী নিয়ে আগের বিভিন্ন গবেষণায় এ বিষয়ে মিশ্র ফল পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এসব গবেষণায় অনেক সময় ডানা বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়াকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ট্রোসকিয়ানকো বলেন, প্রজাপতির ডানাগুলো নমনীয়। উড়ার সময় ডানা দুটি একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে এবং দূরে সরে যায়। ডানাগুলো সামনের দিকে ও পেছনের দিকে ইংরেজি আট সংখ্যার মতো গতিতে ঘোরে। ফলে সামনের ডানার ওপরের কোনো ডোরা নিচের দিকে নামার সময় স্পষ্ট ও তুলনামূলক ধীর গতিতে নামতে দেখা যায়। কিন্তু ডানা ওপরের দিকে ওঠার সময় একই ডোরা দ্রুত ভাঁজ হয়ে যায় এবং ঊর্ধ্বমুখী গতির সঙ্গে মিশে যায়। এতে প্রজাপতির নিচের দিকে যাওয়ার গতি বেশি দৃশ্যমান মনে হয়, যদিও বাস্তবে সেটি ওপরের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গবেষণায় প্রকৃত প্রজাপতির উচ্চগতির ভিডিও ধারণ, কম্পিউটার মডেলিং, অনুকরণভিত্তিক বিবর্তন এবং স্পর্শনির্ভর পর্দায় পরীক্ষা - সবগুলো পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, ডোরাকাটা নকশা গতির সংকেত নির্ধারণকারী বিভিন্ন স্নায়ুচক্রকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘বার্বার পোল ইলিউশন’-এর সঙ্গে মিল রয়েছে। পাশাপাশি চলমান ডোরাগুলোকে দেখে যেমন কোনো বস্তুকে ওপর বা নিচের দিকে সরে যেতে দেখা যায়, প্রজাপতির ডানার নকশাও তেমনি তার প্রকৃত গতিপথ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত তৈরি করে।
এসব নকশা আক্রমণের মুহূর্তে প্রজাপতির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে শিকারির মনে আরো সংশয় তৈরি করে। ট্রোসকিয়ানকোরের ভাষ্য, ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিব্যবস্থা ছাড়া শিকারিদের পক্ষে এই অতিরিক্ত বিভ্রান্তি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
তবে সব প্রজাপতি একই কৌশল ব্যবহার করে না। গবেষকেরা দেখেছেন, যেসব প্রজাপতি তুলনামূলক কম গতিবিভ্রান্তি তৈরি করে, তাদের রং সাধারণত বাদামী বা লাল। অর্থাৎ কিছু প্রজাতি শিকারি এড়াতে গতিবিভ্রান্তির বদলে ছদ্মবেশ বা সতর্কতামূলক রঙের ওপর বেশি নির্ভর করে। এসব রং শিকারিকে সংকেত দিতে পারে যে প্রজাপতিটি বিষাক্ত অথবা এর স্বাদ কটু।
এই দৃষ্টিবিভ্রম বাস্তবে আক্রমণের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করতে গবেষকেরা ১০০ জন মানব স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে প্রায় তিন হাজারবার ভার্চুয়াল প্রজাপতি ধরার পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীরা ভিডিও দেখে পর্দায় স্পর্শ করে প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করেন। যেসব প্রজাপতির ক্ষেত্রে শক্তিশালী দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃত অবস্থানের পেছনে লক্ষ্য স্থির করেছেন।
গবেষকদের মতে, জীবন্ত পাখি ও প্রজাপতি নিয়ে শিকারের পরীক্ষা চালানো অনেক দিক থেকে আদর্শ হলেও বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব এবং নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। গতির দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে জড়িত স্নায়ুচক্র মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে বেশ মৌলিক হওয়ায় গবেষকেরা মনে করছেন, এ গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে সব শিকারির ক্ষেত্রে এই কৌশল সমান কার্যকর নাও হতে পারে। এখন পর্যন্ত গবেষণাটি পাখির দৃষ্টিশক্তিকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। ড্রাগনফ্লাই বা রোবার ফ্লাইয়ের মতো শিকারি পতঙ্গের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যেতে পারে বলে তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব পতঙ্গের দৃষ্টিশক্তি পাখির তুলনায় দ্রুত কাজ করে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিবিভ্রম কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বাস্তবে ড্রাগনফ্লাই ও রোবার ফ্লাই প্রায়ই সফলভাবে প্রজাপতি শিকার করে।
প্রজাপতির আত্মরক্ষার এই কৌশল জীববিজ্ঞানের বাইরেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। উড়োজাহাজ বা যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের অনুকরণব্যবস্থায় গতির উপস্থাপন উন্নত করা থেকে শুরু করে চলমান কর্মী, যান, চালকবিহীন উড়ন্ত যান বা রোবটকে দৃশ্যমান আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় বিশেষ নকশা তৈরিতেও এ গবেষণার ফল কাজে লাগতে পারে।
ট্রোসকিয়ানকো বলেন, তাঁদের তৈরি মডেল সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার পাশাপাশি কৃত্রিম পরিবেশে মানুষের অস্বস্তি ও মানসিক চাপ কমাতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই এখন বেশি আকর্ষণীয় বিষয়। কারণ আশপাশে দ্রুত ঝলকানো, চলমান ও ডোরাকাটা বস্তু অনেক সময় ক্ষতি বা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সানা/আপ্র/২/১০/২০২৬