চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চিরঅন্ধকার গহ্বরে বরফজমা পানির সন্ধানে নিজেদের সবচেয়ে জটিল চন্দ্রাভিযানের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে চীন। দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র গবেষণা ও সেখানে স্থায়ী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীনের এই অভিযান মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্র করে তুলছে।
চীনের পরিকল্পিত ‘চাং’ই-৭’ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুর দুর্গম ও স্থায়ীভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলগুলোতে পানির বরফের সন্ধান এবং সেসব এলাকার পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা। চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের মাটিতে নভোচারী পাঠানো এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পথে এ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান দ্বীপের ওয়েনচাং উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে শক্তিশালী ‘লং মার্চ-৫’ রকেটের সাহায্যে চাং’ই-৭ পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। মনুষ্যবিহীন এই অভিযানে থাকবে একটি অবতরণযান, একটি চলমান অনুসন্ধানযান এবং বিশেষ ধরনের লাফিয়ে চলা অনুসন্ধানযন্ত্র। পাশাপাশি পানির অণু শনাক্ত ও বিশ্লেষণের জন্য থাকবে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, বিশেষ ক্যামেরা ও ভূগর্ভস্থ স্তর পর্যবেক্ষণের রাডার।
চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি দক্ষিণ মেরুর সম্ভাব্য অবতরণস্থলগুলো পরীক্ষা করবে। সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্যাকলটন গহ্বরের প্রান্তবর্তী এলাকা। এই অঞ্চলের কিছু উঁচু স্থান প্রায় সারাবছর সূর্যের আলো পায়, আবার গভীর গহ্বরগুলোর তলদেশে কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি। ফলে একই এলাকায় সৌরশক্তির সম্ভাব্য উৎস এবং প্রাচীন বরফ সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা-দুই সুবিধাই রয়েছে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর প্রতি বিশ্বের মহাকাশ শক্তিগুলোর আগ্রহের মূল কারণই এই পানি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, চিরঅন্ধকার গহ্বরগুলোতে বরফ হিসেবে পানি জমে থাকতে পারে। এসব বরফ ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটিতে পানীয় জল ও অক্সিজেনের উৎস হতে পারে। এমনকি পানিকে উপাদানে বিভক্ত করে মহাকাশযানের জ্বালানি তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে চাঁদের পানি শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বিষয় নয়; ভবিষ্যৎ মহাকাশ অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতির জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
চাং’ই-৭ অভিযানের সবচেয়ে অভিনব প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো লাফিয়ে চলা অনুসন্ধানযন্ত্র। সাধারণ চাকা-চালিত চলমান যান চাঁদের খাড়া ঢাল ও গভীর অন্ধকার গহ্বরে সহজে চলতে পারবে না। তাই বিশেষ এই যন্ত্র ছোট থ্রাস্টার ব্যবহার করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে লাফিয়ে যেতে পারবে। গভীর অন্ধকার এলাকায় নেমে নমুনা ও তথ্য সংগ্রহের পর সূর্যের আলো পাওয়া এলাকায় ফিরে এসে সৌরশক্তিতে নিজেকে পুনরায় শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই অভিযান একক কোনো মিশন নয়; এটি চীনের ধারাবাহিক চন্দ্র কর্মসূচির অংশ। পরবর্তী চাং’ই-৮ অভিযানের তথ্যও ভবিষ্যৎ মানব অভিযান ও চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনায় কাজে লাগবে। অর্থাৎ চীন এখন শুধু চাঁদে পৌঁছাতে চায় না, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী গবেষণা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সম্পদ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে চাইছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছরের এপ্রিলে চার নভোচারীকে নিয়ে আর্টেমিস-২ চাঁদের চারপাশে প্রায় দশ দিনের সফল যাত্রা সম্পন্ন করেছে। ওই অভিযানে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরত্বে গিয়ে মানব মহাকাশযাত্রার নতুন রেকর্ড গড়েন।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে ঘিরে ভারতও ইতোমধ্যে ইতিহাস তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে চন্দ্রযান-৩ সফলভাবে দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণ করে ভারতকে এই অঞ্চলে সফলভাবে অবতরণকারী প্রথম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে চীনের নতুন অভিযান মূলত একটি বৃহত্তর মহাকাশ প্রতিযোগিতারই পরবর্তী অধ্যায়।
একসময় চাঁদে পা রাখাই ছিল মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের সর্বোচ্চ সাফল্য। এখন সেই চাঁদই হয়ে উঠছে পানি, জ্বালানি, গবেষণা, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ বসতির সম্ভাব্য ঘাঁটি। তাই চাং’ই-৭-এর লক্ষ্য শুধু চাঁদের অন্ধকার গহ্বরে বরফ খোঁজা নয়-তার গভীরে লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যতের মহাকাশ সভ্যতার সম্ভাবনাও খুঁজে দেখা।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৩/৮/২০২৬