মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট গ্যাস সংকট সহসা কাটছে না। মেরামতের কাজ শেষ করে টার্মিনালটি আবার চালু হতে আরো চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ সংকট আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় কারিগরি দলের যৌথ প্রচেষ্টায় বন্ধ থাকা এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি সচলের কাজ চলছে। যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে স্থানীয় প্রকৌশলীরা মেরামতকাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে টার্মিনালের কোন যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দিয়েছে বা ক্ষতির পরিমাণ কত, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কবে নাগাদ পুরোপুরি ফিরবে, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
চার দিনে কমেছে ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ থেকে স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ কোটি থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়। এর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার আগে ২০ জুলাই দেশের ছয় বিতরণ কোম্পানির দৈনিক গ্যাস বিতরণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৫৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ২৪ জুলাই তা নেমে আসে ২ হাজার ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চার দিনের ব্যবধানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যেও বলা হয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায়।
রাজধানীর রান্নাঘরে সংকট
এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাধ্য হয়ে অনেকে ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবারকে আগের রাতেই রান্না করে রাখতে হচ্ছে।
মিরপুর, গ্রিন রোড, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে একই পরিস্থিতি চলছে বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
সিএনজি ও শিল্পেও প্রভাব
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশন ও শিল্পকারখানায়ও। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
শিল্পকারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিতাস এলাকায় সংকট বেশি
পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে তিতাস গ্যাসের গ্রাহকদের ওপর।
২০ জুলাই তিতাসের মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস বিতরণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। ২৪ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২১০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চার দিনের ব্যবধানে তিতাস এলাকায় দৈনিক সরবরাহ কমেছে প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট।
এ সময়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহও কমেছে। ফলে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে।
সংকটের মূল দুর্বলতা অবকাঠামোয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো এলএনজি গ্রহণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল
কারণ বর্তমানে বিকল্প এলএনজি গ্রহণ অবকাঠামো সীমিত। ফলে একটি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় সংকটে পরিণত হয়।
পুরোনো পাইপলাইনেও বাড়ছে সমস্যা
তিতাসের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু এলএনজি সংকট নয়, পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনও অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি করছে। বৃষ্টির সময় পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে গেলে গ্যাস চলাচল ব্যাহত হয়। দৃশ্যমান ত্রুটি দ্রুত মেরামত করা গেলেও মাটির নিচে থাকা সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে সময় লাগে।
ঢাকার পুরোনো গ্যাস নেটওয়ার্ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
আরো কয়েক দিন ভোগান্তির আশঙ্কা
সব মিলিয়ে এলএনজি টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সংকটের চাপ কমার সম্ভাবনা কম। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, মেরামতের কাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে এর আগে পর্যন্ত আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, সিএনজি ও বিদ্যুৎ খাতকে আরো কয়েক দিন সংকটের মধ্য দিয়েই যেতে হতে পারে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এখন প্রশ্ন উঠেছে—একটি মাত্র অবকাঠামোগত ত্রুটিতে কেন পুরো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এতটা নাজুক হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?
সানা/আপ্র/২৬/৭/২০২৬