গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মেনু

ঘন ঘন ভূমিকম্পে কী বড় দুর্যোগের শঙ্কা বাড়ছে?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:০২ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৬ এএম ২০২৬
ঘন ঘন ভূমিকম্পে কী বড় দুর্যোগের শঙ্কা বাড়ছে?
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারত ও মিয়ানমার অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সোমবার (২৯ জুন) ভোরে এক ঘণ্টারও কম সময়ে ভারতের মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ ও মেঘালয়ে পরপর তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর আগের রাতেও অরুণাচল প্রদেশে এবং তার আগের দিন মণিপুরে পৃথক ভূমিকম্প আঘাত হানে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে এমন ধারাবাহিক ভূকম্পনের ঘটনায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে ভূকম্পন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরপর কয়েকটি ছোট ভূমিকম্প হওয়া মানেই অচিরেই বড় ভূমিকম্প হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার এসব ভূকম্পনকে একেবারে গুরুত্বহীন বলারও সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভূস্তরের নিচে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং বড় ধরনের ভূমিকম্পের বাস্তব ঝুঁকি বহুদিন ধরেই বিদ্যমান।

ভারতের জাতীয় ভূকম্পনবিদ্যা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টা ১৩ মিনিটে মণিপুরের কাংপোকপি এলাকায় ৩ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। পাঁচ মিনিট পর অরুণাচল প্রদেশ-ভুটান সীমান্তে তিন মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর ভোর ৫টা ৫ মিনিটে মেঘালয়ের পশ্চিম খাসি পাহাড়ে ২ দশমিক ৯ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই অরুণাচল প্রদেশে ৩ দশমিক ২ মাত্রার এবং তার আগের দিন মণিপুরে চার মাত্রার আরো একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

ভূতাত্ত্বিকদের ভাষ্য, বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূকম্পন বলয়ের অংশ। ভারতীয় প্লেট উত্তর ও পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশীয় প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত। এই সংঘর্ষের ফলে ভূস্তরের নিচে বিপুল পরিমাণ চাপ জমা হয়, যা নির্দিষ্ট সময় পর ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্তি পায়। এ কারণেই বাংলাদেশের আশপাশে নিয়মিত ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশের চারপাশে থাকা কয়েকটি সক্রিয় ফল্টলাইন। সিলেটের ডাউকি ফল্ট, মিয়ানমারের সাগাইং ফল্ট, আসাম অঞ্চলের ফল্টব্যবস্থা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসংলগ্ন ভূতাত্ত্বিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতা রাখে। এসব অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগরীগুলোতে মারাত্মক হতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অভ্যন্তরেও ছোট ছোট ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, আগে তুলনামূলক কম সক্রিয় বলে বিবেচিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভূস্তরের অভ্যন্তরীণ চাপের পরিবর্তন কিংবা সুপ্ত ফল্টলাইনের পুনঃসক্রিয়তার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীরা এক বিষয়ে একমত—বর্তমান প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট দিন, সময়, স্থান কিংবা মাত্রা উল্লেখ করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত ‘অমুক দিনে বড় ভূমিকম্প হবে’—এ ধরনের দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। তাই প্রতিটি ভূমিকম্পকে ভবিষ্যৎ বড় দুর্যোগের নিশ্চিত সংকেত হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ দেশের নগর ব্যবস্থাপনা। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও অন্যান্য বড় শহরে বিপুলসংখ্যক ভবন ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু সড়ক, উচ্চ জনঘনত্ব, পুরোনো ভবন, উন্মুক্ত স্থানের সংকট এবং উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বড় ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস নয়; বরং প্রস্তুতি। ভবন নির্মাণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করা, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো এবং জনগণকে নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে সচেতন করে তোলাই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ভূমিকম্প আতঙ্কের নয়, বরং সতর্ক হওয়ার বার্তা। বড় ভূমিকম্প কবে ঘটবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, কিন্তু বাংলাদেশ যে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত—এটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য। তাই ভয় নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর প্রস্তুতিই সম্ভাব্য বড় দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

গুমের শিকার পরিবারকে ভাতার আশ্বাস মির্জা ফখরুলের
২৬ জুন ২০২৬

গুমের শিকার পরিবারকে ভাতার আশ্বাস মির্জা ফখরুলের

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটেই আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখার আশ্বাস দি...

পুরোনো প্রেসক্রিপশনেই সাবিনার খুনিদের সূত্র
২৩ জুন ২০২৬

পুরোনো প্রেসক্রিপশনেই সাবিনার খুনিদের সূত্র

ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরের গঙ্গাশ্রম এলাকার একটি খাল থেকে ভেসে ওঠা স্যুটকেস ঘিরে ২০২০ সাল...

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কি-না সিদ্ধান্ত আদালতের
২৩ জুন ২০২৬

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কি-না সিদ্ধান্ত আদালতের

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনটি ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার একটি প্রচেষ্টা। আপনি কি মনে করেন চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 10 ঘন্টা আগে