গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মেনু

সব্যসাচী শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরপ্রস্থান

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:১৭ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৪ এএম ২০২৬
সব্যসাচী শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরপ্রস্থান
ছবি

মুস্তাফা মনোয়ার -ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায় হলো। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্পগবেষক এবং দেশে পাপেটচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ ধানমন্ডির বাসভবনে নেওয়া হবে। তিনি স্ত্রী মেরী মনোয়ার, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

বয়সজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আবার অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে তাঁর জন্ম। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাকে হারান মুস্তাফা মনোয়ার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার ছোট।

নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হলেও শিল্পের টানে যোগ দেন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। ১৯৫৯ সালে সেখান থেকে চারুকলায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। জলরঙে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা সে সময়ই ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর শিল্পকর্ম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, অল্প রেখা ও রঙেই গভীর বক্তব্য তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের।

ভাষা আন্দোলনের সময় কিশোর বয়সেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার পরিচয় দেন তিনি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কার্টুন আঁকার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন থেকে শুরু করে শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। পরে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিকশিত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, ঢাকা কেন্দ্রের মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং শিক্ষামূলক পাপেট উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর সৃষ্ট পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক শিশু চরিত্র ‘মীনা’ নির্মাণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান **‘নতুন কুঁড়ি’**-র অন্যতম রূপকারও ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের **‘রক্তকরবী’** এবং উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক অবলম্বনে নির্মিত **‘মুখরা রমণী বশীকরণ’**-এর মতো নাট্যনির্মাণে তাঁর সৃজনশীলতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করে।

চিত্রকলা, নাট্যনির্দেশনা, সংগীত, অ্যানিমেশন, পাপেট, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক গবেষণাসহ বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের জন্য তিনি দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। এছাড়া টেলিভিশন নাটক, চারুকলা, শিশু সংস্কৃতি ও পাপেটশিল্পে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ সৃজনযাত্রা, শিল্পভাবনা এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে দীর্ঘদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা: চিফ প্রসিকিউটর
২৯ জুন ২০২৬

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা: চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্য...

মোহাম্মদপুরে ‘পাটালি গ্রুপের’ আট সদস্য গ্রেফতার
২৯ জুন ২০২৬

মোহাম্মদপুরে ‘পাটালি গ্রুপের’ আট সদস্য গ্রেফতার

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা ও রায়েরবাজার এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে কুখ্যাত ‘পাটালি গ্রুপ’-এর সে...

প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ালে সাইবার আইনে গ্রেফতার করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী
২৮ জুন ২০২৬

প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ালে সাইবার আইনে গ্রেফতার করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যম...

৪৭তম বিসিএস চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, ১৫২১ জন সুপারিশপ্রাপ্ত
২৮ জুন ২০২৬

৪৭তম বিসিএস চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, ১৫২১ জন সুপারিশপ্রাপ্ত

৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট বিতর্ক ও হেয় প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনটি ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার একটি প্রচেষ্টা। আপনি কি মনে করেন চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 10 ঘন্টা আগে