প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মতবিনিময় সভা ও নৈশভোজে সরকারের সফলতা, শরিকদের মর্যাদা, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারত্ব, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও ঐক্য অটুট রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আমন্ত্রিত নেতারা। একই সঙ্গে তাঁরা সরকারের কর্মকাণ্ডে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আরও নিয়মিত যোগাযোগ ও কার্যকর সম্পৃক্ততার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
সোমবার (২০ জুলাই) রাতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ৪১টি রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বর্তমান সময়ে দেশ পরিচালনায় তারেক রহমানের কোনো বিকল্প তিনি দেখছেন না। অতীতে তাঁর সঙ্গে হওয়া একটি আলাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় তিনি তারেক রহমানকে বলেছিলেন, তাঁর সামনে মাহাথির মোহাম্মদ কিংবা কামাল আতাতুর্কের মতো রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখনো তিনি সেই প্রত্যাশাই করেন।
সরকারের উদ্দেশে মান্না বলেন, “আমি চাই এই সরকার সফল হোক। আপনারা ব্যর্থ হলে, আমি ব্যর্থ হব, দেশ ব্যর্থ হবে, সবাই ব্যর্থ হবে।”
তিনি বলেন, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্বপ্ন একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে ওঠা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ তিনি বর্তমান সময়েই দেখতে চান।
সরকারের সমালোচনা করার গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মান্না বলেন, ভুল হলে তা বলার সুযোগ থাকতে হবে এবং সমালোচনাকে যেন নেতিবাচকভাবে দেখা না হয়। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্রের মূল শক্তিই হলো অকপটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গত পাঁচ মাসে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের প্রশংসা করে মান্না বলেন, বর্তমান সরকার অতীতের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাফল্যের পাশাপাশি ভুলের সম্ভাবনাও থাকে, তাই সব সময় সচেতন থাকতে হবে।
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারের সামনে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে এবং গত পাঁচ মাসে সরকারের বেশ কিছু কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ও তারেক রহমানের সামনে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব এসেছে। দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে পারলে শুধু বিএনপিই নয়, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও দেশের ভবিষ্যৎও আরও শক্তিশালী হবে।
তবে তিনি শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, শরিকদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত না হলে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হবে। একসঙ্গে চলতে হলে পারস্পরিক সম্মানবোধকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম সরকারের পাঁচ মাসের বিভিন্ন সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বিশেষভাবে এবারের হজ ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এবার অভিযোগমুক্তভাবে হজ পরিচালিত হয়েছে।
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী শরিক দলগুলোর প্রতি সরকারি মূল্যায়নের ঘাটতির অভিযোগ তুলে বলেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে তাঁদের যথাযথভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় না এবং কেন্দ্র থেকে জেলা—সব পর্যায়েই শরিকদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এর জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ বিষয়ে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই; শরিকদের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, দীর্ঘ দুই দশকের আন্দোলন, ত্যাগ ও আত্মদানের ধারাবাহিকতায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান।
বৈঠক শেষে মান্নার মূল্যায়ন
মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, তাঁর উপলব্ধি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি না হোক এবং তারা ঐক্যবদ্ধ থাকুক।
তিনি জানান, বৈঠকটি ছিল মূলত সৌজন্যমূলক; কোনো নির্ধারিত আলোচ্যসূচি ছিল না। বিভিন্ন নেতা নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেছেন। কেউ সরকারের অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ অভিযোগ করেছেন যে সরকার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে শরিকদের যথেষ্ট সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না।
মান্না বলেন, সরকারের গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ডের ভালো-মন্দ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ, রাষ্ট্র সংস্কার কিংবা ৩১ দফা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
তিনি বলেন, “আমরা আন্দোলনের শরিক ছিলাম এবং এখনো চাই সরকার সফল হোক। তবে এটি এমন কোনো বৈঠক ছিল না যে সরকার সংকটে পড়ে আমাদের সহযোগিতা চাইতে ডেকেছে।”
ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিবের বক্তব্য প্রসঙ্গে মান্না বলেন, বৈঠক অবশ্যই হওয়া উচিত, তবে সেটি যেন শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবেও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়।
সানা/আপ্র/২১/৭/২০২৬