গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

মেনু

হঠাৎ পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৩৫ পিএম, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৫৬ এএম ২০২৬
হঠাৎ পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ফজিলাতুন নেসা শাপলা

গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়েছ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এটি পরীক্ষার্থীদের জীবনে বেশ বড় ও অর্থবহ, তাই তারা স্বভাবতই খুব উদ্বিগ্ন থাকেন। পরীক্ষার হলে বসাটাই তাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কী করবে, ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা, কেমন রেজাল্ট করবে এ নিয়ে ভীষণ মানসিক চাপে থাকে এবং এক ধরনের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যায়। এ সময় তাদের সাহস দরকার, ঠাণ্ডা মাথা দরকার। পরীক্ষার জন্য নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশ দরকার। অথচ ব্যাপারটা আমাদের দেশে উল্টোভাবে ঘটে।

কোনো পাবলিক পরীক্ষা শুরু হলেই মাঝে মাঝেই বিশেষ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো রীতিমতো নাট্যশালায় পরিণত হয়। ক্যামেরার ক্লিক ও হোমরা-চোমরা কর্তাব্যক্তিদের পরিদর্শনের মধ্য দিয়েই পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে হয়। পরীক্ষার্থীদের আর নিরিবিলিতে পরীক্ষা দেয়া হয় না। হালের সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে পরীক্ষার্থীদের প্রাইভেসি বলে কিছু নেই।

প্রশ্ন হলো, মন্ত্রী বা তার প্রতিনিধি দল কি সরাসরি পরিদর্শনে যেতে পারেন? হ্যাঁ, বাংলাদেশে ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ অনুযায়ী পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় সরকার যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই প্রশাসনিকভাবে একজন মন্ত্রী বা তার প্রতিনিধি কেন্দ্র পরিদর্শনের এখতিয়ার রাখেন।

ফলাফল হলো, পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেই মন্ত্রী, মন্ত্রী পদমর্যাদা সম্পন্ন কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা সশরীরে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাদের উদ্দেশ্য মোটেও খারাপ নয়। তারা মূলত পরীক্ষার্থী ও হল পরিদর্শকদের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে নকল ও দুর্নীতিমুক্ত পবিত্র পরিবেশ নিশ্চিত করতে চান। সেটি করতে গিয়ে তারা সমাজের কাছে দুই ধরনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রথমত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ নেই। দ্বিতীয়ত, সরকারপক্ষ একটা সুষ্ঠু পাবলিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে দ্বিধান্বিত বা ব্যর্থ। নইলে একজন মন্ত্রীকেই কেন তক্কে তক্কে থাকতে হবে এবং বিনা নোটিসে গিয়ে কেন্দ্রে হাজির হতে হবে? এ দ্বিপক্ষীয় আস্থাহীনতার কারণে বিপাকে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। 
মনে রাখতে হবে, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরাই সারা বছর প্রচণ্ড পরিশ্রম করে পরীক্ষা দিতে বসে। দু-চারজন বাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের অসৎ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে না। তাই পরীক্ষার হলে তাদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা শিক্ষাজীবনের অধিকারের মধ্যে পড়ে। সরকারের উচিত সে অধিকার রক্ষা করতে সচেষ্ট হওয়া। সারা বছর পরীক্ষার্থীরা যা পরিশ্রম করে, ওই প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটাতে পরীক্ষার হলের পরিবেশ শান্ত থাকা খুব জরুরি।

পরীক্ষার সময় মানুষের মস্তিষ্ক মূলত তথ্যের পুনরুদ্ধার ও বিশ্লেষণে ব্যস্ত থাকে। এ সময় শিক্ষার্থীদের গভীর মনোযোগ প্রয়োজন। তাই সামান্য শব্দ বা বাইরের হস্তক্ষেপ ছেলেমেয়েদের ফোকাস ও মনোযোগ নষ্ট করে দিতে পারে। একবার মনোযোগ ছুটে গেলে পুনরায় সে স্তরের মনোযোগে ফিরতে একজন মানুষের গড়ে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে (একে বলা হয় কনটেস্ট সুইচিং কস্ট)। ফলে সময় অপচয় হয় অনেক বেশি।

পরীক্ষার হলে বিঘ্ন, যেমন উচ্চ শব্দ, মন্ত্রীর প্রটোকল বা কারো আকস্মিক প্রবেশ ঘটার ফলে হঠাৎ মনোযোগ নষ্ট হলে অনেক পরীক্ষার্থীর হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে এবং হাত-পা ঘামতে শুরু করতে পারে, যাকে প্যানিক অ্যাটাকের প্রাথমিক পর্যায় বলা যেতে পারে। আর কোনো শিক্ষার্থীর যদি আগে থেকেই পরীক্ষা ভীতি থাকে, তাহলে পরীক্ষার হলে বসে তার রীতিমতো প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে। এ ছাড়া মনে রাখা জরুরি পরীক্ষা চলাকালীন অকস্মাৎ বিঘ্ন ঘটলে মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ (যা তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে) সাময়িকভাবে কাজ করা কমিয়ে দেয়। তখন জানা জিনিসও শিক্ষার্থী ভুলে যায়।

যারা ঘটা করে পরিদর্শনে যান, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন- যেখানে একজন অল্পবয়সি শিক্ষার্থীকে একই সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন ও বাইরের কোনো হট্টগোল বা পরিস্থিতির দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে, সেখানে তার মাথা ঠাণ্ডা করে পরীক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে এবং বেড়ে যেতে পারে খাতায় ভুল করার প্রবণতা। এ ছাড়া সহজেই অনুমেয় যে, অস্থির বা অকস্মাৎ পরিবেশের কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থীর একটা পরীক্ষা খারাপ হয়; তাহলে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে, আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলোয় ভালো করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেশে কখনই তৈরিই হয়নি, সেটা হলো পরীক্ষার্থীদের প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। পরীক্ষার্থীদের প্রাইভেসি রক্ষা করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি সফল ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন পদ্ধতির অপরিহার্য অংশ। যখন একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে বসেন, তখন তার চারপাশের পরিবেশ সরাসরি তার পরীক্ষায় প্রভাব ফেলে। পরীক্ষার হলে প্রাইভেসি না থাকলে অল্পবয়সী যেকোনো শিক্ষার্থী স্পট লাইট ইফেক্টের শিকার হতে পারেন। মনোবিজ্ঞানে ‘স্পটলাইট ইফেক্ট’ বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায়- যেখানে একজন মনে করতে পারেন তার প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাহলে পরীক্ষার হলে মন্ত্রী, সাংবাদিক বা অতিরিক্ত পরিদর্শক বারবার যাতায়াত করার ফলে কেউ কেউ এ ইফেক্টেরে মধ্যে চলে যেতে পারেন। কেউ তাকে সর্বক্ষণ লক্ষ করছেন বা দেখছেন, এ সচেতনতা একজন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক চিন্তাপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ফলে তিনি আর গুছিয়ে লিখতে পারবেন না এবং জানা উত্তরও ভুল করে বসবেন। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থী যে একই রকম সমান সুযোগ পাচ্ছেন, পরীক্ষার হলের প্রাইভেসি তা নিশ্চিত করে।

যদি কোনো বিশেষ কক্ষে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা বারবার পরিদর্শন করেন, তাহলে সে কক্ষের শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় বেশি মানসিক চাপে থাকবে- এটিই কি খুব স্বাভাবিক নয়? সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, এভাবেই যে রুমে পরিদর্শক যাচ্ছেন মূলত তিনি ওই শিক্ষার্থীদেরও অবমূল্যায়ন করছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন কোনো কঠিন কাজে গভীর মনোযোগ দেয়, তখন সে ‘ফ্লো স্টেট’ নামক এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছায়। মানসিক এ অবস্থায় মানুষের সৃজনশীলতা ও কার্যক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা ক্যামেরা যদি শিক্ষার্থীর প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করে, তবে এ ‘ফ্লো’ ব্যাহত হয়। একবার এ মানসিক সংযোগ ব্যাহত হলে পুনরায় সে স্তরের গভীর মনোযোগে ফিরতে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। ততক্ষণে পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বেজে উঠতে পারে।

শুধু যে পরীক্ষার হলের প্রাইভেসি ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকছে বিষয়টা, সেটি নয়। পরীক্ষার হলে ঘটে যাওয়া যে কোনো ঘটনা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ছে। কোনো অঘটন ছাড়া শিক্ষার্থী যে রুমে বসে পরীক্ষা দিচ্ছেন, সে ছবি ভাইরাল হলেও শিক্ষার্থী মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। উন্নত বিশ্বগুলোর পরীক্ষা ব্যবস্থা ও আইনের দিকে যদি তাকাই তাহলে কী দেখতে পাই?

জাপান, আমেরিকা এসব দেশে পরীক্ষার্থীর ডেস্কে গিয়ে ঝুঁকে পড়া বা অনুমতি ছাড়া তার উত্তরপত্র দেখা অত্যন্ত অভদ্রতা ও বিধিবহির্ভূত কাজ হিসেবে গণ্য হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত একাডেমিক মুহূর্ত বা তথ্য তার অনুমতি ছাড়া প্রদর্শন করা আইনত দণ্ডনীয়।

নকল প্রতিরোধ বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো মারাত্মক অপরাধ প্রতিহত করার জন্য পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটানো কোনো সঠিক উপায় হতে পারে না। এতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ছাড়াও অন্য শিক্ষার্থীরা ভীষণভাবে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নকল বা অন্যান্য অনিয়ম প্রতিহত করার হাজারটা পদ্ধতি আছে। সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ করা যেতে পারে। হুটহাট পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করতে যাওয়া মূলত সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতারই প্রকাশ পায়।

প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে আমরা যে অসভ্যতা করছি এবং যেখানে সন্তানদের ওপর কোনো আস্থা রাখতে পারছি না, সেখানে সন্তানদের আত্মমর্যাদাবোধ কীভাবে গড়ে উঠবে? কীভাবে আমরা তাদের দায়িত্বশীল করে তুলব? আমাদের সামনে গভীর প্রশ্ন, আমরা আমাদের সন্তানদের কোন শিক্ষায় বড় করছি?

লেখক: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আপ্র/কেএমএএ/০৩.০৫.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়
১৩ মে ২০২৬

কাপাসিয়ার রক্তে রঞ্জিত পরিবারের প্রশ্ন- মানুষ কেন আপনজনের খুনি হয়

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ সামাজিক দ...

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ
১০ মে ২০২৬

সুশাসনের স্বপ্নে এক মানবিক বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আ...

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব
১০ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের কারণ এবং তার প্রভাব

আব্দুর রহমান পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পেয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভা...

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়
০৯ মে ২০২৬

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়

মনজুরুল আলম মুকুলস্বাধীনতার পর দেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে কাউকে কখনও এমন বুক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই