ড. মতিউর রহমান
কয়েক বছর আগেও আপেল, কমলা, আঙুর, মাল্টা, নাশপাতি ও ডালিম ছিল অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কেনাকাটার তালিকার সাধারণ সব পণ্য। বর্তমানে আমদানিকৃত ফল কেনাটা ক্রমশই একটি বিশেষ বা কালেভদ্রে ঘটা ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এই পরিবর্তনটি কেবল দামের ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়, বরং শিশু, বয়স্ক বা রোগীদের জন্য ফল কিনতে গিয়ে পরিবারগুলোকে যেসব ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে, তার মধ্যেও তা স্পষ্ট।
বাজারে সাম্প্রতিক চিত্রটি বেশ চমকপ্রদ। ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাজারে পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী গালা ও ফুজি আপেল প্রতি কেজি ৩৮০-৪২০ টাকা, গোল্ডেন আপেল প্রায় ৪৫০ টাকা, সবুজ আপেল ৩৮০-৫২০ টাকা, কমলা ৩৫০-৪৮০ টাকা, মাল্টা ৪২০-৪৫০ টাকা, আঙুর ৪৩০-৫৫০ টাকা, ডালিম ৪০০-৬৫০ টাকা এবং নাশপাতি প্রতি কেজি প্রায় ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। কোনো কোনো দোকানে একেকটি মাল্টার দামই পড়ছে প্রায় ১০০ টাকা। পুষ্টিমানের বিচারে এগুলো কোনো বিলাসপণ্য নয়; অথচ চড়া দামের কারণে সাধারণ পরিবারের কাছে এগুলো ক্রমেই বিলাসপণ্যের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।
সামগ্রিক বাজারে পাইকারি ও খুচরা মূল্যের মধ্যেও বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। ২৬ সেপ্টেম্বরের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাদামতলী পাইকারি বাজারে লাল আপেল প্রতি কেজি প্রায় ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও বিভিন্ন খুচরা বাজারে তা ২৮০–৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মরিয়ম খেজুরের পাইকারি দর ছিল প্রায় ৪৪০ টাকা, অথচ কোনো কোনো খুচরা বাজারে তা দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায় যে, চূড়ান্ত মূল্য কেবল আমদানি ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং পরিবহন, সংরক্ষণ, পচনজনিত ক্ষতি, বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার হারও এতে ভূমিকা রাখে। এই সমস্যাটিকে কেবল একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
আমদানিকৃত ফলের যাত্রা শুরু হয় আন্তর্জাতিক বাজারদর ও মুদ্রা বিনিময়ের হার দিয়ে। ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ১২২.৭৬ টাকা। আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের সামান্য পরিবর্তনও বৈদেশিক কেনাকাটায় টাকার অঙ্কে খরচের পরিমাণ বদলে দেয়। এরপর এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাজ ভাড়া, বিমা, বন্দর হ্যান্ডলিং বা খালাস খরচ, ক্লিয়ারিং চার্জ এবং দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনের খরচ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় পণ্যের চূড়ান্ত আমদানি মূল্য (ল্যান্ডেড কস্ট)।
কর বা শুল্কের বিষয়টিও এর একটি বড় উপাদান। বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোয় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর একাধিক স্তরের শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে যে, পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের (অ্যাসেসেবল ভ্যালু) সাথে প্রযোজ্য কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক এবং অন্যান্য কর যোগ করার পরই আমদানির পর্যায়ে ভ্যাট হিসাব করা হয়। বর্তমান শুল্ক তালিকা অনুযায়ী অনেক ধরণের তাজা ফলের ওপর ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ধার্য করা আছে; তবে অন্যান্য বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ার পর মোট করের প্রকৃত হার অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। কিছু তাজা ফলের ক্ষেত্রে প্রকাশিত শুল্ক হিসাব অনুযায়ী মোট করের বোঝা ১০০ শতাংশেরও বেশি। এটি একটি জটিল নীতিগত প্রশ্ন তৈরি করে।
ফল কেবল সাধারণ কোনো বিলাসপণ্য বা ঐচ্ছিক ভোগের সামগ্রী নয়; ভিটামিন, খনিজ উপাদান, আঁশ (ফাইবার) এবং খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য যোগ করে। যখন পারিবারিক আয়ের তুলনায় ফলের দাম অনেক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, তখন এর প্রভাব কেবল আর্থিক নয়; বরং পুষ্টির ওপরও পড়ে। দরিদ্র পরিবারগুলো হয়তো আমদানি করা ফল কেনাই বন্ধ করে দেয়, আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হয়তো কেনার পরিমাণ কমিয়ে দেয় অথবা কম বৈচিত্র্যময় ও সস্তা কোনো খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অসুস্থতার সময় এই প্রভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে ফলের চাহিদা বেড়েছিল কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পরিবারগুলো তাদের সেরে ওঠার সময় ফল ও তরল খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছিল। একটি কমলা বা মাল্টার দাম যখন প্রায় ১০০ টাকা হয়, তখন অসুস্থ পরিবারের সদস্যের জন্য সামান্য কিছু ফল কিনতেই বেশ বড় অঙ্কের খরচ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বা অসুস্থতা একটি বাড়তি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যার ফলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে।
বর্তমান বাজারে একটি আপাত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমদানি করা ফলের সরবরাহ বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম সে অনুপাতে কমেনি। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ২৩ হাজার ৭১৭ টন, আগস্ট মাসে ৪১,১৮৬ টন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে ২৩,৫উ৩৬ টন ফল আমদানি করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ার অর্থ হলো, চূড়ান্ত খুচরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বিস্তৃত ব্যয়-শৃঙ্খল বা খরচের ধাপসমূহ ভূমিকা রাখছে। এই শৃঙ্খলের মধ্যে রয়েছে অর্থায়নের খরচ, ঋণপত্র (এলসি) খোলার খরচ, মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামার ঝুঁকি, বন্দরে বিলম্ব, পণ্য খালাস, পরিবহন, হিমাগারে সংরক্ষণ এবং অপচয়জনিত ক্ষতি।
তাজা ফল পচনশীল পণ্য। পণ্যবাহী চালান আসতে দেরি হলে কিংবা চাহিদা কমে গেলে আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতাদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া খুচরা বিক্রেতাদেরও ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বহন করতে হয়। এই খরচগুলো যৌক্তিক হলেও, পণ্যের দামের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে ভোক্তাদের পক্ষে তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাইকারি ও খুচরা মূল্যের মধ্যকার ব্যবধানটি বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। ১৮০ টাকায় কেনা কোনো আপেল যদি ৩০০ টাকায় ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তাহলে সেই পার্থক্যকে সরাসরি ‘অতিরিক্ত মুনাফা’ বা ‘মুনাফাখোরি’ বলা যায় না। কারণ পণ্যটি হাতবদল হওয়ার সময় বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের খরচ যুক্ত হয়। কিন্তু দামের এই ব্যবধান যদি দীর্ঘস্থায়ী এবং অস্বাভাবিক রকমের বেশি হয়, তাহলে তা নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও উন্নত বাজার-তথ্য ব্যবস্থা- যাতে ভোক্তা, ব্যবসায়ী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আমদানি খরচ, পাইকারি মূল্য ও খুচরা মূল্যের পারস্পরিক সম্পর্কটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। তাই সরকারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আমদানিকৃত ফল থেকে যেমন শুল্ক-রাজস্ব আয় হয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল থাকে, তেমনি এটি ভোক্তাদের এমন সব পণ্য পাওয়ার সুযোগ করে দেয়- যা স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। আবার হঠাৎ করে শুল্ক তুলে নিলে তা রাজস্ব আয় ও বাজারের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এমন কর কাঠামো- যা পুষ্টিকর ও মৌলিক খাদ্যকে অত্যধিক ব্যয়বহুল করে তোলে, তা জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর লক্ষ্যের পরিপন্থী হতে পারে।
একটি অধিকতর যৌক্তিক পন্থা হলো বিলাসপণ্য ভোগ এবং পুষ্টির মধ্যে পার্থক্য করা। আপেল, কমলা, মাল্টা, নাশপাতি ও আঙুরের মতো বহুল ব্যবহৃত ফলের ক্ষেত্রে শুল্ক নীতি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে; বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বা বিনিময় হারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। শুল্ক ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল না করেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময়ে সাময়িক সমন্বয় বা ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কেবল কর কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনে আরও জোরালো প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। আমদানি করা ফলের পরিমাণ, পাইকারি দর এবং খুচরা মূল্যের সম্ভাব্য পরিসর নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অস্বাভাবিক মুনাফা বা বাড়তি দাম সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ডিজিটাল বাজার তথ্য, উন্নত কোল্ড-চেইন সুবিধা এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা পণ্য নষ্ট হওয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবিদার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই আম, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, আনারস ও তরমুজের মতো নানা ধরনের ফল উৎপাদন করে থাকে। উন্নত জাতের ফল চাষ, ফসল তোলার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, হিমাগার সুবিধা, মান অনুযায়ী বিন্যাস (গ্রেডিং), প্যাকেজিং এবং আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সারা বছরই দেশি ফল সহজলভ্য করা সম্ভব হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যালু চেইন বা মূল্য সংযোজন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে তা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের আয়ও বৃদ্ধি করবে। দূরবর্তী বাজার থেকে আসা আপেল, আঙুর, নাশপাতি, মাল্টা এবং অন্যান্য ফল- যা সারা বছর দেশে পাওয়া যায় না—সেগুলোর চাহিদা ভোক্তাদের মধ্যে অব্যাহত থাকবে। আসল প্রশ্ন হলো, এ ধরনের খাবার পাওয়ার বিষয়টি কি ক্রমেই কেবল পরিবারের আয়ের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
পুষ্টিকর খাবার যখন সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়, তখন তা সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। অসুস্থ আত্মীয়ের জন্য কয়েকটি কমলা কিংবা সন্তানের জন্য একটি আপেল কেনার আগে কোনো পরিবারকে যদি দুবার ভাবতে হয়, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল ফলের দামের চেয়েও গভীর। এটি মূলত কর ব্যবস্থা, বিনিময় হার, পণ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা (লজিস্টিকস), বাজারের কাঠামো, আয় বৈষম্য এবং দুর্বল সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার পারস্পরিক প্রভাবেরই প্রতিফলন। এর একটি বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং মুদ্রা বিনিময় বাজারের ওপর চাপ সামলাতে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময় ধরে হিমশিম খেতে হয়েছে। যদিও মোট আমদানির তুলনায় ফলের হিস্যা সামান্য, তবুও এর মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অন্যান্য অনেক আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের মতোই। ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানিকারকদের সেই বাড়তি খরচের বোঝা সরবরাহ শৃঙ্খলের কোনো না কোনো পর্যায়ে সমন্বয় বা পুষিয়ে নিতে হয়।
বাণিজ্য অর্থায়নের জন্য ব্যাংকগুলো যখন বাড়তি ফি নেয় কিংবা আমদানিকারকরা বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা ও সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন, তখনও একই বিষয় প্রযোজ্য। এ কারণেই বিদেশের কোনো ফলের বাগান এবং ঢাকার খুচরা বাজারের মধ্যে একটি আপেলের দামের সাধারণ তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বাগান থেকে গৃহস্থালির রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে এর পেছনে নানা স্তরের খরচ ও ঝুঁকি জড়িত থাকে। ফলটি প্যাকেট করা, পরিবহন, বিমা করা, কাস্টমস বা শুল্ক ছাড় করানো, বন্দর থেকে পাইকারি বাজারে নেওয়া, উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণ এবং নষ্ট হওয়ার আগেই বিক্রি করা- এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিলম্বই এর মান ও মূল্য কমিয়ে দিতে পারে। তাই নীতিগত চ্যালেঞ্জটি হলো- সব দামের পার্থক্যকেই অতিরিক্ত মুনাফার প্রমাণ হিসেবে না দেখে বরং অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে পরিহারযোগ্য খরচগুলো কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।
ভোক্তা সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত। প্রতিটি খুচরা বিক্রেতাকে প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করার পরিবর্তে বাজার তদারকির সময় স্বচ্ছ ওজন পরিমাপ, সঠিক লেবেলিং, পণ্যের গুণমান এবং দাম প্রকাশের বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার তখনই ভালোভাবে কাজ করে, যখন ভোক্তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে এবং তারা বিভিন্ন এলাকা ও দোকানের মধ্যে দামের তুলনা করতে পারেন। এর একটি সামাজিক দিকও রয়েছে- যা আরও বেশি মনোযোগ দাবি করে। ফল খাওয়ার বিষয়টি প্রায়শই শহরের স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত। কিন্তু দাম বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
সচ্ছল আয়ের পরিবারগুলো বাড়তি দামের বোঝা সামলে নিতে পারলেও, যারা আয়ের দিক থেকে প্রান্তিক সীমার কাছাকাছি বসবাস করেন, তাদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। সময়ের সাথে সাথে এটি বিভিন্ন আয়ের গোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্যের গুণমানের পার্থক্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত জাতীয় আলোচনার মধ্যেই এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। খাদ্য কেনার সক্ষমতা কেবল চাল, ভোজ্যতেল বা শাকসবজির দাম দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জন্য বৈচিত্র্য প্রয়োজন। কোনো পরিবার যদি ক্যালোরি জোগাড় করতে সক্ষম হয় কিন্তু নিয়মিতভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার কেনার সামর্থ্য না রাখে, তবে খাদ্যনিরাপত্তা অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
আমদানিকৃত ফলকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা এর সমাধান নয়। বাংলাদেশ এখন ক্রমেই নগরায়ণমুখী ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত একটি অর্থনীতি। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক খরচগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে বাজারকে আরও দক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। আমদানিকৃত ফল হঠাৎ করেই স্বভাবগতভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠেনি; বরং বাহ্যিক খরচ এবং অভ্যন্তরীণ নীতি ও বাজারের পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবেই বাংলাদেশে এর দাম বেড়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও অনেক কিছুই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব। যেকোনো মূল্যে সস্তায় ফল পাওয়াটা লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং এমন একটি বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত যেখানে পুষ্টিকর খাবার মোটামুটি সহজলভ্য হবে, ব্যবসায়ীরা লাভজনকভাবে কার্যক্রম চালাতে পারবেন এবং সরকার রাজস্ব আয় করতে পারবে- ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে।
খাদ্যনীতির প্রকৃত পরীক্ষাটি শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে পরিবারগুলো বৈচিত্র্যময় খাদ্যের সংস্থান করতে পারছে কি না তার ওপর। ফল যখন বিলাসপণ্যে পরিণত হয়, তখন তা কেবল ফলের বিষয় নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে, পরিবারের বাজেটে পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং সম্মানজনক জীবনযাত্রার জন্য বরাদ্দ অর্থের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬