মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দ্রুত উন্মুক্ত করার পাশাপাশি আরও বেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২২ জুন) পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সমৃদ্ধ করছে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈঠকে অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা প্রদান এবং সম্ভব হলে আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে এবং কর্মীদের ব্যয় হ্রাস করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের অধিকার, নিরাপত্তা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের শোষণ, দুর্ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ ও নিপীড়নের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুই দেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা উভয় দেশের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখবে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগে মালয়েশিয়াকে আহ্বান
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে দেশটির উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উনিশশ ঊনআশি সালের এপ্রিল মাসের মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছিল। একইভাবে উনিশশ তিরানব্বই সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করেছে।
উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং মানুষে-মানুষে নিবিড় সম্পর্কের ভিত্তিতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়েছে। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে উভয় দেশ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তিনি বলেন, যৌথ কমিশনের বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনাসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, অর্ধপরিবাহী শিল্পসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন এবং তাদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য মূল্যবান।
সাংস্কৃতিক সহযোগিতায় সমঝোতা স্মারক সই
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত দুটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করেছে দুই দেশ।
সোমবার পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তাদের উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও দলিল বিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উতামা হাজি মোহাম্মদ বিন হাজি হাসান নিজ নিজ দেশের পক্ষে দলিল বিনিময় করেন।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পরদানা পুত্রা’য় পৌঁছালে তাদের স্বাগত জানান আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তার স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর দুই নেতা প্রথমে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পরে তাদের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
সানা/আপ্র/২২/৬/২০২৬