দেশের অর্থনীতিকে ‘সবার অংশগ্রহণমূলক’ কাঠামোয় রূপান্তরের ঘোষণা দিয়ে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের প্রতিটি নাগরিককে বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ‘পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বের হয়ে নতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা হচ্ছে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীতে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সবার জন্য এই বাজেট। সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই দেশের প্রতিটি মানুষকে বাজেট কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।”
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই এ বাজেটকে তিনি ‘নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’ থেকে সরে আসার ঘোষণা: সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সুবিধা বণ্টনের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
তার ভাষায়, “গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, নতুন বাজেটের দর্শন হলো সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির সুফল সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া।
কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চাপ: অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বাজেট একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকার মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।
ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর শর্ত: সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণের কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্প মূল্যায়ন করা হবে চারটি মূল ভিত্তিতে—ব্যয়ের মূল্যমান, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক কার্যকারিতা।
তিনি বলেন, “প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে আমরা ‘ভ্যালু ফর মানি’, ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ এবং ‘জব ক্রিয়েশন’ নিশ্চিত করব।”
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত অবস্থান: বাজেটোত্তর আলোচনায় মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নীতিগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে না।”
তার মতে, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে মূল্যস্ফীতি চাপ তৈরি করেছে।
তিনি আরো বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোই সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি, কারণ এটি নিয়ন্ত্রণে এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “মূল্য নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বা প্রশাসনিক চাপ দিয়ে নয়, নীতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করতে হবে।”
বিনিয়োগে বড় সংস্কার উদ্যোগ: বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ জানাতে একটি পৃথক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদন বিলম্ব এবং অনিয়ম দূর না করলে বিনিয়োগ কাঠামো শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।
তিনি আরো জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে, যেখানে প্রকল্পের অগ্রগতি রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
তার ভাষায়, “প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে কে দায়ী, কোথায় ব্যর্থতা—সবই দৃশ্যমান হবে।”
‘বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ’: অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, “আমরা চাই পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নই মূল শক্তি হোক।” বাজেটের বাস্তবায়ন সফল হলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআরের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/১২/৬/২০২৬