এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত পরীক্ষকদের পরিবর্তে শিক্ষার্থী ও কিশোরদের দিয়ে খাতা মূল্যায়ন, নম্বর গণনা এবং ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাট করানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পাবলিক পরীক্ষার গোপনীয়তা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, পরীক্ষকের বদলে কয়েকজন তরুণ ও শিক্ষার্থী গোল হয়ে বসে এসএসসির উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছে। কেউ খাতা পড়ছে, কেউ নম্বর দিচ্ছে, আবার কেউ ওএমআর শিট পূরণের কাজ করছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নসংক্রান্ত অন্তত আটটি ভিডিও ও রিলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, যশোর ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের উত্তরপত্র দেখা গেছে। ঢাকা ও কুমিল্লাসহ কয়েকটি বোর্ডের আগের বছরের খাতা মূল্যায়নের ভিডিওও নতুন করে প্রচার করা হয়েছে।
ভিডিওগুলোর ক্যাপশনেও ছিল চটকদার ভাষা। কোথাও লেখা হয়েছে, ‘সবার সাথে বসে এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখলাম’, আবার কোথাও বলা হয়েছে, ‘এখানে কার কার ভবিষ্যৎ আছে কমেন্ট করে জানাও’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক স্বীকার করেছেন, সময় স্বল্পতা, অবহেলা এবং অতিরিক্ত আয়ের প্রবণতা থেকে কিছু পরীক্ষক শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের কাজ করান। এক পরীক্ষক জানান, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের হাতে একটি ‘মডেল উত্তরপত্র’ ধরিয়ে দিয়ে সেই অনুযায়ী নম্বর দিতে বলা হয়। কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্নে ভিন্নধর্মী উত্তরের মূল্যায়ন করার মতো অভিজ্ঞতা তাদের না থাকায় প্রকৃত মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাজধানীর এক সিনিয়র শিক্ষক জানান, একজন পরীক্ষককে স্বল্প সময়ে ৩০০ থেকে ৫০০ খাতা মূল্যায়ন করতে হয়। পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর চাপ থাকায় অনেকে নিজের পরিবর্তে বিশ্বস্ত শিক্ষার্থী বা পরিচিতদের দিয়ে খাতা দেখান। পরে তারা শুধু নম্বর যাচাই করে স্বাক্ষর করেন।
আরেক পরীক্ষক বলেন, সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় নম্বর গণনা ও ওএমআর শিট পূরণের ক্ষেত্রে। ময়মনসিংহ বোর্ডের এক পরীক্ষকের ভাষ্য, অনেকেই এসব কাজকে ‘যান্ত্রিক’ মনে করে নিজের সন্তান বা শিক্ষার্থীদের দিয়ে করান। অথচ সামান্য ভুলেই একজন পরীক্ষার্থীর ফল বিপর্যস্ত হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, খাতা শিক্ষকের বাসা বা কক্ষে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকায় গোপনীয়তাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা যে গুরুতর অপরাধ করছেন, সে বিষয়ে তাদের সচেতনতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন বা পরীক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে এ ধরনের অপরাধের জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পৌঁছেনি। যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার করা হয়। তবে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই বা বোর্ডের তদন্ত টিমের মাধ্যমে তদন্ত করা হবে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জি. এম. শহীদুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষকদের শুরু থেকেই কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তারা নিজেরাই গোপনীয়তার সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন করেন এবং অন্য কাউকে সম্পৃক্ত না করেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীও জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো তাদের নজরে আসেনি।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সানা/আপ্র/৯/৫/২০২৬