গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

মেনু

আজ পহেলা বৈশাখ; ঐতিহ্য, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মহামিলনে বাঙালির নতুন বছরের যাত্রা

নববর্ষে আলোর প্রত্যাশা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০২:১১ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৩ এএম ২০২৬
নববর্ষে আলোর প্রত্যাশা
ছবি

চৈত্রের শেষ প্রহরের নিঃশব্দ বিদায় পেরিয়ে আজ নতুন সূর্যের আলোয় জেগে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত প্রাণ -ফাইল ছবি

চৈত্রের শেষ প্রহরের নিঃশব্দ বিদায় পেরিয়ে আজ নতুন সূর্যের আলোয় জেগে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত প্রাণ। পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩-বাংলা নববর্ষের এই শুভক্ষণে বিদায় নিয়েছে পুরনো বছরের ক্লান্তি, ব্যর্থতা ও গ্লানি; আর নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে জাতির হৃদয়ে জেগেছে আলোর প্রত্যাশা, সম্ভাবনার দীপ্ত আহ্বান।

“মুছে যাক গ্লানি”-এই চিরন্তন বাণী আজ কেবল কবিতার পঙ্ক্তি নয়; বরং বাঙালির আত্মার গভীর উচ্চারণ, নবজাগরণের অনিবার্য অঙ্গীকার।

চৈত্রের বিদায়, বৈশাখের আগমন: বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তির নীরব বিষণ্নতা গতকাল মিলিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। বছরের শেষ সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির জীবনে নেমে আসে একধরনের স্মৃতিকাতরতা-পুরনো হিসাব, পুরনো ব্যর্থতা, পুরনো ক্লান্তি।

আজ সেই অতীতকে পিছনে ফেলে নতুন সূর্যের প্রথম আলোয় শুরু হলো নতুন যাত্রা। পহেলা বৈশাখ তাই কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি সময়ের পুনর্জন্ম, আত্মার পুনর্গঠন, এবং জাতিগত চেতনার নবায়ন।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব: পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়। এটি কেবল উৎসব নয়-এটি বাঙালির অস্তিত্বের ভাষা, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবং আত্মপরিচয়ের গর্বিত প্রকাশ।

এই দিনে বাঙালি ফিরে তাকায় নিজের শিকড়ে-লোকজ সংস্কৃতি, কৃষিনির্ভর জীবনধারা, হালখাতা, মেলা, গান, কবিতা ও শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে। অতীতের ঐতিহ্য আর বর্তমানের বাস্তবতা মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক সর্বজনীন উৎসবের পরিসর।

নববর্ষের দার্শনিক বার্তা: নববর্ষ বাঙালিকে কেবল আনন্দ দেয় না, দেয় আত্মশুদ্ধির আহ্বান। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়-মানুষের জীবন কেবল অতীতের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এই দিন আমাদের শেখায়-ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে, এবং বিভাজন ভুলে ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে। তাই পহেলা বৈশাখ একাধারে উৎসব, আত্মপর্যালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন।

গণতন্ত্রের নতুন প্রেক্ষাপটে নববর্ষ: এবারের নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। দীর্ঘ সময়ের শাসন-পরিবর্তনের পর দেশে নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে জাতি নববর্ষকে বরণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় পুনর্গঠনের প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

উৎসবের সর্বজনীন বিস্তার: ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আজ উৎসবের ঢেউ। রঙ, আলো, গান আর শোভাযাত্রায় মুখর হয়ে উঠেছে নগর ও গ্রাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এবারের প্রতিপাদ্য-

নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান: শোভাযাত্রায় লোকজ প্রতীকী মোটিফ হিসেবে স্থান পেয়েছে মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া-যা বাঙালির জীবনের সংগ্রাম, সৃজন ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি বহন করে। রমনা বটমূলে ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ভোরের প্রথম আলোয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করেছে, যেখানে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছে প্রভাত।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বর্ণিল নববর্ষ উদযাপন: বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের বাণী বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ক্রোড়পত্র আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং লোকজ উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় সব অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে জাতীয় সংগীত ও বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী গান পরিবেশনের মাধ্যমে।

মেলা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত উপস্থিতি: বাংলা একাডেমি ও বিসিকের যৌথ উদ্যোগে সাত দিনব্যাপী নববর্ষ মেলা শুরু হয়েছে, যেখানে গ্রামীণ শিল্প, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে ১৪ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা, যা লোকসংস্কৃতির জীবন্ত প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। এই আয়োজনগুলো কেবল বিনোদন নয়-বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক প্রকাশ।

গ্রাম থেকে শহর: দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আজ বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়েও শোভাযাত্রার আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মানুষের দোরগোড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পালন করছে এই উৎসব, যেখানে অংশ নিচ্ছে শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম।

সামাজিক পরিসরে নববর্ষের মানবিক ছোঁয়া: নববর্ষ উপলক্ষে কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারগুলোতে পরিবেশন করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাবার। শিশুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা উৎসবকে আরো মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে। দেশের সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান উন্মুক্ত রাখা হয়েছে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা হয়েছে বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা: নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে চেকপোস্ট, সিসিটিভি মনিটরিং এবং টহল ব্যবস্থা। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াডও সক্রিয় রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে-নববর্ষ উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই।

নাম বিতর্ক ও সংস্কৃতির প্রবাহমানতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শোভাযাত্রা একসময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত ছিল, যা ২০১৬ সালে ইউনেসকো স্বীকৃতি পায়। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন ও বিতর্কের মধ্যেও বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চা থেমে থাকেনি। এবারের আয়োজন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ধারণ করলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজেদের মতো করে ঐতিহ্যকে বহন করছে। এটি প্রমাণ করে-সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়, বরং সময়ের সঙ্গে প্রবাহমান এক জীবন্ত ধারা।

রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের বার্তায় সম্প্রীতি ও উন্নয়নের আহ্বান: রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, নববর্ষ আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। তিনি সমাজে বিভাজন দূর করে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বও নববর্ষকে উন্নয়ন, ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্রভাতে আলোর প্রতিজ্ঞা: আজকের পহেলা বৈশাখ তাই শুধু উৎসব নয়-এটি নতুন শপথের দিন। অতীতের গ্লানি পেরিয়ে বাঙালি আজ দাঁড়িয়ে আছে আলোর প্রত্যাশায়, নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে।

এই নবপ্রভাতে একটাই উচ্চারণ-
পুরনো ক্লান্তি নয়, নতুন আলোয় গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ।
সানা/আপ্র/১৪/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

গরম কমবে কবে জানালো আবহাওয়া অফিস
০৩ জুন ২০২৬

গরম কমবে কবে জানালো আবহাওয়া অফিস

সারাদেশের অধিকাংশ জায়গায় তাপপ্রবাহ বইছে। এই তাপপ্রবাহ আজও অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ৫ জুন (শুক্রবার) স...

সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান
০৩ জুন ২০২৬

সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের...

ঢাকায় আজ বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে, কমতে পারে তাপমাত্রা
০৩ জুন ২০২৬

ঢাকায় আজ বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে, কমতে পারে তাপমাত্রা

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বুধবার (৩জুন) বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহা...

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন ড. খলিলুর রহমান
০৩ জুন ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন ড. খলিলুর রহমান

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বর্তমান সরকারের চারমাস পূর্ণ না হতেই হঠাৎ মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক এই পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে সরে গেলেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে