রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দুই বছর পর তদন্ত শেষে ২২ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ঢাকার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের সাততলা ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়, যাতে ৪৬ জন নিহত এবং ৭৫ জন জীবিত উদ্ধার হন। নিহতদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনের নিচতলার ‘চায়ের চুমুক’ কফিশপে ব্যবহৃত একটি বৈদ্যুতিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ঘন ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে এবং আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, ভবনের অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট ও কফিশপে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ কিংবা বৈধ ট্রেড লাইসেন্স ছিল না। ভবনটি অনুমোদিত নকশা অমান্য করে নবম তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয় এবং আবাসিক অংশও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
তদন্তে বলা হয়, আগুন লাগার পর ভবনের বিভিন্ন তলায় থাকা মানুষজন বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রধান সিঁড়ি ছিল একমাত্র নির্গমন পথ, যা গ্যাস সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত ছিল। ফলে দ্রুত বের হতে না পেরে অনেকেই ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং শ্বাসরোধে অচেতন হয়ে পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুনের পর প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে পারেননি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিল পরিশোধ ছাড়া কাউকে বের হতে না দেওয়ার অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা দুর্ঘটনার সময়ও খোলা হয়নি। ফলে ওই রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।
অভিযোগপত্রে ভবনে দাহ্য পদার্থ, গ্যাস সিলিন্ডার এবং অবৈধ স্থাপনার উপস্থিতিকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে অনেকে দিক হারিয়ে ফেলেন এবং বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
এ ঘটনায় রমনা থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। তদন্ত শেষে পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- চায়ের চুমুক কফিশপের স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ, ম্যানেজার মুন্সি হামিমুল আলম বিপুল, কাচ্চি ভাই, খানাজ ও তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জেইন উদ্দিন জিসান, জেস্টি রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ষষ্ঠ তলার ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম খান, মেজবানিখানা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, অ্যামব্রোশিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজা ইন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ, মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ।
তদন্তে আরো বলা হয়, ভবনের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে একাধিক রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করা হতো এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না।
এছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলেও মৃত্যুর কারণে স্পেস মালিক এ.কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে আনোয়ার হোসেন সুমন ও শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধেও জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
মামলায় বলা হয়, নিচতলার একটি রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ভিন্ন বর্ণনাও তদন্তে উঠে এসেছে। মুহূর্তেই আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে, ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন আটকা পড়ে প্রাণ হারান ও আহত হন।
এ ঘটনায় বর্তমানে ১১ জন আসামি গ্রেফতার হলেও সবাই জামিনে আছেন এবং ১৩ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। আদালত আগামী ১৯ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছে।
সানা/আপ্র/৩/৪/২০২৬