ভালো চাকরির আশায় চার মাস আগে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার যুবক মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে ইউক্রেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২২ মে) বিকালে রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বন্ধুর পাঠানো ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর পরিবার জানতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমরানুল কবির।
নিহত জাহাঙ্গীর উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল-বাগপাড়া গ্রামের প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার ইউক্রেন সীমান্তের রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এক বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে জাহাঙ্গীরও ছিলেন।
জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই জাভেদ জানান, তার ভাইয়ের বন্ধু মৃদুল ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে রাশিয়ার একটি সেনা ক্যাম্পে কর্মরত মৃদুলের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি আরো জানান, একই ঘটনায় আরো দুই বাংলাদেশি নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন। নিহত অপর দুজন হলেন মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান।
ভিডিও বার্তায় মৃদুল দাবি করেন, ‘আরাফা আল মনোয়ার এজেন্সি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের রাশিয়ায় পাঠায়। পরে বিভিন্ন কৌশলে তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এ ঘটনার জন্য তিনি ওই এজেন্সিকে দায়ী করেন।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে। মা জাকিয়া বেগম ছেলের শোকে বারবার ভেঙে পড়ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি আর কিছু চাই না। টাকা-পয়সা লাগবে না, আমার ছেলেটারে শুধু ফেরত চাই।”
আড়াই বছর বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাশুকা হোসাইন বলেন, “ভালো চাকরি করে সংসারের ভাগ্য ফেরাতে রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাকে যুদ্ধে পাঠানো হলো। এ যুদ্ধে শুধু সে না, আমরাও যেন শেষ হয়ে গেলাম।”
জাহাঙ্গীরের শ্বশুর রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সদস্যরা পরে জানতে পারেন তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তিনি জাহাঙ্গীরকে যেকোনো উপায়ে দেশে ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেই সুযোগ আর হয়নি।
তিনি জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের শেষবার কথা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, কিছুদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের বাবা রাজমিস্ত্রি এবং মা জাকিয়া বেগম পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। করোনাকালে পরিবারটি ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে। মাধ্যমিক পাসের পর জাহাঙ্গীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও আর্থিক সংকটের কারণে আবার গ্রামে ফিরে যান। চার মাস আগে ভালো চাকরির আশায় শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সহায়তায় রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমরানুল কবির বলেন, “অফিসিয়ালি কোনো তথ্য না পেলেও পরিবারের কাছ থেকে আমরা মৃত্যুর খবর জেনেছি। জাহাঙ্গীর রাশিয়া সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন।”
এর আগে গত ২ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলায় একই উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের বাসিন্দা রিয়াদ রশিদ (২৮) নিহত হন।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৩/৫/২০২৬