রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রায় বিশ মাস পর শুরু হল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম। প্রথম দিনই রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং শোকপ্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের সূচনা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকাল এগারটা পাঁচ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের আগে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্ষে প্রবেশ করলে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। সংসদ সদস্য হিসেবে এই প্রথম অধিবেশনে অংশ নেন তিনি এবং প্রথম দিনই সংসদ নেতার আসনে বসেন।
জ্যেষ্ঠ সদস্যের সভাপতিত্বে প্রথম অধিবেশন
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রকাশ্যে না থাকা এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে থাকায় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
সংসদ নেতা তারেক রহমান তার নাম প্রস্তাব করলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তা সমর্থন করেন। পরে সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে এতে সম্মতি জানান।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ভোলা–তিন আসনের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন এবং হুইপ রাকিবুল ইসলাম তা সমর্থন করেন। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় কণ্ঠভোটে তিনি স্পিকার নির্বাচিত হন।
এরপর নেত্রকোণা–এক আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন।
পরে সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করান।
শোকপ্রস্তাবে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের নাম
সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে দেশি–বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিরা এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
এই শোকপ্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই ব্যক্তিরা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয় এবং নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্ব পাওয়া রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন যেন সংসদে ভাষণ না দেন।
বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে রাষ্ট্রপতির প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে বিরোধী দলের আসনে থাকা কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান এবং প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা হট্টগোল শুরু করেন এবং একপর্যায়ে স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারের অগ্রাধিকার
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তার ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে। এ ছাড়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
একশ তেত্রিশ অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন
অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে জারি করা মোট একশ তেত্রিশটি অধ্যাদেশ সংসদের অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এসব অধ্যাদেশ উত্থাপন করতে হয় এবং ত্রিশ দিনের মধ্যে অনুমোদন না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না। এসব অধ্যাদেশ পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য চৌদ্দ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
সংসদীয় রীতি মানার আহ্বান নতুন স্পিকারের
অধিবেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে সংসদীয় রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলার বিষয়ে সদস্যদের সতর্ক করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা মনোযোগ দিয়ে পড়া উচিত।
বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে প্রথম দিনের অধিবেশন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর সাব্বির আহমেদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম দিনে খুব বড় কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেনি।
তার ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ফল বলেই মনে হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে বিরোধী দলের ওয়াকআউট প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষে স্পিকার অধিবেশন আগামী পনেরো মার্চ সকাল এগারটা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
সানা/আপ্র/১৩/৩/২০২৬