পুরান ঢাকার কলতাবাজারে র্যাবের পরিচয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রক্টরিয়াল দলের হস্তক্ষেপে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন আহমেদ এ ঘটনার নেপথ্যে থাকতে পারেন।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোর ৬টার দিকে কলতাবাজার খাদ্য গুদামের সামনে একটি বাসার সপ্তম তলায় এ ঘটনা ঘটে। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন মমতাজ।
মমতাজের অভিযোগ, চুরির মালামাল কেনার একটি মামলার আসামি হিসেবে তাকে আটক করার কথা বলে পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি ভোরে তার বাসায় আসেন। প্রথমে তারা নিজেদের পরিচয় না দিয়ে দরজা খোলার জন্য চাপ দিতে থাকেন। প্রায় ১০ মিনিট পর নিজেদের র্যাব সদস্য বলে পরিচয় দেন তারা। তবে তাদের নাম ও কোন ব্যাটালিয়ন থেকে এসেছেন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন মমতাজ।
দরজায় ধাক্কাধাক্কি ও জোরাজুরির একপর্যায়ে তিনি জরুরি সেবার নম্বরে ফোন করেন। তার ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পর ওই ব্যক্তিরা নিজেদের র্যাব সদস্য বলে জানান। পরে র্যাবের আরো কয়েকটি গাড়ি সেখানে আসে।
মমতাজের দাবি, র্যাব পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা তার বাসায় তল্লাশি চালান। কী খুঁজছেন জানতে চাইলে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি। পরে তাকে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। মামলাটি কে করেছেন, কী অভিযোগ এবং তাকে আটক করার কোনো কাগজ বা পরোয়ানা আছে কি না জানতে চাইলে ‘থানায় গেলেই জানতে পারবেন’ বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
মমতাজ বলেন, তিনি বারবার আটক করার কারণ ও পরোয়ানা দেখতে চাইলেও কোনো কাগজ দেখানো হয়নি। তাকে গাড়িতে তোলার আগে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দিতে বলা হয় এবং কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল দলের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, নাম এবং মমতাজকে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চান। শিক্ষকেরা পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে সুনির্দিষ্ট কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেন মমতাজ। একপর্যায়ে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং মুঠোফোনও ফেরত দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান।
মমতাজের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে চুরি করা স্বর্ণ কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বাসায় তল্লাশি চালিয়েও কোনো চুরি করা মালামাল পাওয়া যায়নি। তার ঘর সম্পূর্ণ তছনছ করে তল্লাশি চালানো হলেও কিছু পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পরে তিনি জানতে পারেন, ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় চুরির মালামাল কেনার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় লেনদেনের জন্য যে দুটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো তিনি ব্যবহার করেন না বলেও দাবি করেন মমতাজ। বিষয়টি যাচাই করতে তার মুঠোফোনের কলতালিকা, লেনদেনসহ অন্যান্য তথ্য পরীক্ষা করার দাবি জানান তিনি।
নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ
মমতাজের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন আহমেদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষ্য, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তার বোনের সঙ্গে সুমনের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকেই তাদের পরিবারের সঙ্গে সুমনের বিরোধ চলে আসছে।
মমতাজের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তাদের হুমকি, গালিগালাজ ও মানসিক হয়রানি করা হয়েছে এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় দিনাজপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোন নম্বর পরিবর্তন করার পরও নতুন নম্বর সংগ্রহ করে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তার বোনের বন্ধুদের কাছেও বিভিন্ন নম্বর থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মমতাজ আরো অভিযোগ করেন, তার বোনের সাবেক স্বামী তাদের পরিবারকে এক সপ্তাহের মধ্যে ‘খেলা দেখানোর’ হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মমতাজ বলেন, শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা ঘটনাস্থলে না থাকলে তার কী হতো, তা তিনি জানেন না। একই সঙ্গে প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন আহমেদের বিরুদ্ধে র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হয়ে কাজ করার অভিযোগও করেন। তার দাবি, সুমন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেছেন এবং একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি পেশাদার হ্যাকার হিসেবেও কাজ করতেন বলে অভিযোগ করেন মমতাজ। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি।
মমতাজের ভাষ্য, তার বোনের সাবেক স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ, হুমকি ও আগের সাধারণ ডায়েরির বিভিন্ন নথি তাদের পরিবারের কাছে রয়েছে। তার বাবা-মা দেশের বাইরে থাকায় সংবাদ সম্মেলনের সময় সেসব নথি দেখাতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে দেখতে পান। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব এবং ঘটনাটি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে আসা ব্যক্তিরা র্যাবের সদস্য ছিলেন এবং একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিলেন। পরে পুলিশ জানতে পারে, বিষয়টি পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি মামলা।
মমতাজ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি করবেন। একই সঙ্গে নিজের, পরিবারের সদস্য ও মেসের সহপাঠীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
তবে মমতাজের অভিযোগের বিষয়ে তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন আহমেদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সানা/আপ্র/৭/৯/২০২৬