চট্টগ্রাম নগরীর আমবাগান রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন হিজড়া কলোনির বাসা থেকে হিজড়া সম্প্রদায়ের নেত্রী মোহাম্মদ মহসীন ওরফে মৌসুমী হিজড়ার (৫২) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক যুবককে শনাক্ত করে তাকে গ্রেফতারের জন্য খুঁজছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, মৌসুমীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তার গলায় আঘাতের দাগ, জিহ্বা বেরিয়ে থাকা, একটি চোখ ফুলে যাওয়া এবং মুখে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এসব আলামত দেখে তাকে মারধরের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার আমবাগান রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন হিজড়া কলোনির বাসা থেকে মৌসুমীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর তার বাসায় থাকা টাকা ও ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোনও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় শনিবার রাতে খুলশী থানায় মামলা করেন নিহতের বাবা রুস্তম আলী। মৌসুমীর বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায়।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক মৌসুমীর কক্ষে প্রবেশের পর প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। ওই যুবক রাত ১টা ১৪ মিনিটে কক্ষে প্রবেশ করেন এবং রাত ৩টা ৫২ মিনিটে বের হয়ে যান।
মৌসুমীর কক্ষে এত সময় ওই যুবক কী করছিলেন, তা নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণে ওই যুবককে খুঁজছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, তাকে পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
পুলিশ ও স্থানীয় হিজড়া সম্প্রদায়ের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমী হিজড়া সম্প্রদায়ের একটি অংশের কাছে ‘গুরুমা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ওই বাসায় একাই থাকতেন। শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা পর্যন্ত তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করেন। এরপর নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমাতে যান।
ভোররাতের দিকে পাশের কক্ষের বাসিন্দারা তার ঘর থেকে বাগবিতণ্ডার শব্দ শুনতে পান। তবে পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলছেন মনে করে তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। শনিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মৌসুমী ঘুম থেকে না ওঠায় প্রতিবেশীরা তাকে ডাকতে যান। এ সময় তারা বাসার দরজা খোলা দেখতে পান। শয়নকক্ষে বিছানার ওপর মৌসুমীকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
বাসার পেছনে মৌসুমীর নিজের একটি গরুর খামার রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার ওই খামারের একটি গরু বিক্রি করা হয়। গরু বিক্রির টাকা মৌসুমীর কাছে ছিল। শনিবার সকালে তার আরো একটি গরু কেনার কথা ছিল। তবে ঘটনার পর ওই টাকা এবং তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়নি।
মৌসুমীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবিতে তারা বিক্ষোভ করেন। এলাকার একাধিক হিজড়া সদস্যও মৌসুমীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন।
হিজড়া পাখি রহমান বলেন, শনিবার সকাল ১০টার দিকে ঘরে ঢুকে তিনি মৌসুমীর মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখেন। তার জিহ্বা বের হয়ে ছিল। এরপর আশপাশের সবাইকে ডাকাডাকি করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। মৌসুমীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
খুলশী থানার উপপরিদর্শক গোলাম মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মৌসুমী হিজড়ার মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার রাতে থানায় মামলা হয়েছে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন। মামলার তদন্ত চলছে। ওই রাতে মৌসুমীর বাসায় এক যুবক প্রায় তিন ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন। হত্যায় জড়িত সন্দেহে তাকে খোঁজা হচ্ছে। তাকে গ্রেফতার করা গেলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য জানা যাবে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, মৌসুমী হিজড়া হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া যুবককে ঘিরে তদন্ত চলছে। তাকে গ্রেফতার করা গেলে এ ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, তা বেরিয়ে আসবে।
সানা/আপ্র/৭/৯/২০২৬