গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

একসময় রিকশাই ছিল প্রেমের বাহক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:১৯ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৮:০৫ এএম ২০২৬
একসময় রিকশাই ছিল প্রেমের বাহক
ছবি

ছবি সংগৃহীত

একটি রিকশা, দুজন মানুষ আর শহরের ব্যস্ত রাস্তা—প্রেমের গল্পের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু যেন লাগত না। তখন হাতে হাতে মুঠোফোন ছিল না, মুহূর্তেই বার্তা পাঠানোর সুযোগও ছিল না। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করাটাই ছিল বড় ঘটনা। আর দেখা হয়ে গেলে পাশাপাশি বসে রিকশায় চেপে শহরের অলিগলি পেরিয়ে যাওয়ার সময়টুকু হয়ে উঠত দিনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি।

আজকের দ্রুতগতির শহরে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। দূরত্ব কমেছে, যোগাযোগ সহজ হয়েছে; কিন্তু অপেক্ষার সেই মায়া যেন কমেছে। তাই পুরোনো দিনের রিকশার কথা উঠলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে শুধু যাতায়াতের স্মৃতি নয়, প্রেম, বন্ধুত্ব, বৃষ্টি, বিকেল আর দুজন মানুষের একান্ত আলাপের ছবিও।

জাপান থেকে বাংলার শহরে

রিকশার ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর উদ্ভাবন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয়, ‘রিকশা’ শব্দটি জাপানি ‘জিনরিকিশা’ থেকে এসেছে। ‘জিন’ অর্থ মানুষ, ‘রিকি’ অর্থ শক্তি এবং ‘শা’ অর্থ বাহন—অর্থাৎ মানুষের শক্তিতে চালিত বাহন।

গবেষক এম উইলিয়াম স্টিলির ‘রিকশা ইন সাউথ এশিয়া, ইন্ট্রোডাকশন টু স্পেশাল সেকশন’ গবেষণা অনুযায়ী, ১৮৬৯ সালে জাপানে কাহার-টানা পালকির বিকল্প হিসেবে রিকশা চালু হয়। পরে সেখান থেকে চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুরে ছড়িয়ে পড়ে এ বাহন।

প্রথমদিকে রিকশা আজকের পরিচিত তিন চাকার প্যাডেলচালিত বাহনের মতো ছিল না। জাপানে এর উৎপত্তি হলেও নকশাটি করেছিলেন জোনাথন স্কোবি নামে এক মার্কিন খ্রিষ্টান মিশনারি। পঙ্গু স্ত্রীকে ইয়োকোহামা শহর ঘুরিয়ে দেখানোর উদ্দেশ্যে ১৮৬৯ সালে তিনি ‘জিনরিকিশা’ তৈরি করেন।

পরবর্তী সময়ে রিকশা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৮০ সালে রেভারেন্ড জোর ফরডাইসের মাধ্যমে এটি ভারতে আসে। ১৯০০ সালে কলকাতায় রিকশার প্রচলন শুরু হয়। তবে তখন সাধারণ যাত্রী পরিবহনের চেয়ে মালামাল বহনের কাজেই এর ব্যবহার বেশি ছিল।

ঢাকার রাস্তায় রিকশার আগমন

পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশে প্রথম রিকশা আসে চট্টগ্রামে। সেটি আনা হয়েছিল মিয়ানমারের রেঙ্গুন থেকে। ঢাকায় প্রথম রিকশা আসে ত্রিশের দশকে ভারতের কলকাতা থেকে।

ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে প্রচলিত প্যাডেলচালিত সাইকেল রিকশা এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। তবে এর বিস্তার একদিনে হয়নি। সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে রিকশা ঢাকার নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

ঢাকায় রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বদলে যায় শহরের চলাচলের দৃশ্যও। ছোট ছোট গলি, সরু রাস্তা, পুরোনো মহল্লা কিংবা ব্যস্ত বাজার—সবখানেই রিকশা হয়ে ওঠে পরিচিত বাহন। একসময় যে বাহন ছিল কেবল প্রয়োজনের, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে শহরের সংস্কৃতির অংশ।

রিকশা হয়ে উঠল প্রেমের বাহক

রিকশার সবচেয়ে রোমান্টিক দিক ছিল এর ধীর গতি। গাড়ির মতো ছুটে যেত না এটি। ফলে পাশাপাশি বসে দুজন মানুষের কথা বলার জন্য হাতে থাকত খানিকটা বাড়তি সময়।

কখনো স্কুল-কলেজ শেষে দেখা, কখনো বিকেলে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা, কখনো বন্ধুর অজুহাতে দেখা করতে যাওয়া—তারপর দুজনের একসঙ্গে প্যাডেলচালিত রিকশায় ওঠা। গন্তব্য হয়তো খুব দূরে নয়, তবু পথটা যেন শেষ হতে চাইত না। কারণ তখন গন্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পথ।

হুডের আড়ালে তৈরি হতো ব্যক্তিগত পৃথিবী

রিকশার হুড ছিল সেই সময়ের প্রেমের গল্পে আলাদা এক চরিত্র। ব্যস্ত রাস্তার মাঝেও হুড তুলে দিলে চারপাশ থেকে খানিকটা আড়াল তৈরি হতো। একেবারে ব্যক্তিগত জায়গা না হলেও দুজনের মধ্যে তৈরি হতো এক ধরনের স্বস্তি।

সেখানে চলত ফিসফিস করে কথা, অভিমান, মান-অভিমান, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কিংবা একেবারেই সাধারণ গল্প। কখনো হয়তো দুজন পাশাপাশি বসে থেকেছে, কিন্তু খুব বেশি কথা বলেনি। তবু সেই নীরবতাটুকুও ছিল সম্পর্কেরই অংশ।

বৃষ্টির দিনে রিকশার প্রেম

বৃষ্টি আর রিকশার সম্পর্কও ছিল আলাদা। হুডে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, ভেজা রাস্তার ওপর চাকার ধীর চলাচল, পাশের মানুষের গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকার স্মৃতি অনেকের কাছেই প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কখনো হুডের ভেতর থেকে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টিভেজা শহর দেখা, কখনো একই ছাতার নিচে দুজনের গা ঘেঁষে বসে থাকা—রিকশা তখন শুধু বাহন নয়, হয়ে উঠত স্মৃতির বাক্স।

অপেক্ষারও ছিল আলাদা সৌন্দর্য

আজ একটি ফোন করলেই জানা যায় মানুষটি কোথায়। বার্তা পাঠালে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উত্তর আসতে পারে। কিন্তু একসময় দেখা করার আগে এত সহজে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো।

দূর থেকে একটি রিকশা এগিয়ে আসতে দেখলে মনে হতো—এই তো, সে এসেছে!

আবার কখনো দেখা হওয়ার কথা থাকলেও মানুষটি দেরি করত। অপেক্ষা করতে করতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকা, প্রতিটি রিকশার দিকে চোখ চলে যাওয়া—সেই অপেক্ষাও ছিল প্রেমেরই অংশ।

রিকশা তাই শুধু একটি বাহন নয়

ঢাকার রিকশা এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরের স্মৃতি, লোকশিল্প, কর্মজীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা থেকে দেখলে রিকশা আরও অনেক কিছু।

কারো কাছে এটি প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি, কারো কাছে বৃষ্টিভেজা বিকেল, কারো কাছে বন্ধুত্বের গল্প। আবার কারো কাছে হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের সময়।

সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, বদলে গেছে যোগাযোগের ধরন ও মানুষের চলার গতি। তবু পুরোনো কোনো রিকশা চোখে পড়লে কিংবা বৃষ্টির দিনে হুড তোলা একটি রিকশা ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে গেলে অনেকের মনে ফিরে আসে সেই দিনগুলোর কথা।

একটি রিকশা, দুজন মানুষ আর শহরের ব্যস্ত রাস্তা—এইটুকুতেই একসময় তৈরি হয়ে যেত একটি সম্পূর্ণ গল্প।

সূত্র: আরামকো ওয়ার্ল্ড, ইউনেস্কো, এরা নাও

এসি/আপ্র/২২/৯/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

আজ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করা দিবস
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করা দিবস

সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেই ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ, নেই তীব্র যানজট। কেউ হেঁটে, কেউ বাসে, আবার...

মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই সন্ধান করলেও প্রতিষ্ঠা পায়নি শান্তি
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই সন্ধান করলেও প্রতিষ্ঠা পায়নি শান্তি

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি দিন খুব কমই আছে- যার সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের এত নিবিড় সম্পর্ক। শান্তি ছাড়া...

সারাদিন কর্মব্যস্ততার স্বামীর প্রশংসায় সব ক্লান্তি ভুলে যান স্ত্রী
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সারাদিন কর্মব্যস্ততার স্বামীর প্রশংসায় সব ক্লান্তি ভুলে যান স্ত্রী

সংসার মানেই শুধু ঘর, দায়িত্ব আর ব্যস্ততা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, অভিমান, যত্ন, ত্যাগ আর এক...

ঢাকার ব্যস্তজীবনের অবসরে ভিন্নধর্মী সংযোজন ‘অ্যাকুরিয়াম পার্ক’
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকার ব্যস্তজীবনের অবসরে ভিন্নধর্মী সংযোজন ‘অ্যাকুরিয়াম পার্ক’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে নতুন বি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই