প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে চিনি ছাড়া টক দই খেলে খাদ্যতালিকায় যুক্ত হতে পারে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া। নিয়মিত এক মাস টক দই খেলে হজমের স্বাস্থ্যসহ শরীরের কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সবার শরীরে এর প্রতিক্রিয়া এক নয়।
হজমের স্বাস্থ্যে উপকার হতে পারে
টক দই তৈরির সময় দুধের ল্যাকটোজ ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয়। এ কারণে দইয়ে কিছু জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তবে টক দই খেলেই গ্যাস, অম্বল বা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘদিন হজমের সমস্যা থাকলে এর প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা জরুরি।
ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের উৎস
টক দইয়ে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন থাকে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রোটিন শরীরের পেশি ও বিভিন্ন টিস্যু গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই নিয়মিত পরিমিত টক দই খেলে খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টির একটি ভালো উৎস যুক্ত হতে পারে।
তবে শুধু দই খেয়ে শরীরের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি, ফল ও বাদামের মতো পুষ্টিকর খাবারও নিয়মিত খেতে হবে।
পেট ভরা রাখতে পারে
দইয়ের প্রোটিন কিছু সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় নাশতা বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে টক দই ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে চিনি, মিষ্টি ফলের সিরাপ বা অন্যান্য মিষ্টি উপাদানযুক্ত দই নিয়মিত খেলে বাড়তি চিনি শরীরে যেতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে সাধারণ, চিনি ছাড়া টক দই বেছে নেওয়া ভালো।
রক্তে শর্করার ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য উপকার
কিছু গবেষণায় নিয়মিত দই খাওয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এর কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তাই টক দইকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ডায়াবেটিস থাকলে চিনি ছাড়া সাধারণ টক দই খাওয়াই ভালো।
অন্ত্রের জন্য উপকারী হতে পারে
অন্ত্রে থাকা অসংখ্য অণুজীব হজম ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ফারমেন্ট করা খাবার হিসেবে টক দই কিছু উপকারী জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করতে পারে।
তবে সব ধরনের দইয়ে একই পরিমাণ বা একই ধরনের জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকে না। বাজারের দই কেনার সময় উপাদানের তালিকায় জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি উল্লেখ আছে কি না, তা দেখে নেওয়া যেতে পারে।
রাতে টক দই খাওয়া কি ক্ষতিকর?
সুস্থ মানুষের জন্য রাতে পরিমিত টক দই খাওয়া নিজে থেকেই ক্ষতিকর—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রাতে দই খেলেই সর্দি হবে বা শরীরে কফ জমবে—এমন দাবিরও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে কারও ক্ষেত্রে রাতে দই খেলে পেটের অস্বস্তি, অম্বল বা বুক জ্বালার সমস্যা বাড়তে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সবার শরীরে একই প্রভাব পড়ে না
দুধজাত খাবার সবার শরীর একইভাবে গ্রহণ করে না। যাদের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা রয়েছে, তাদের অনেকেই দুধের তুলনায় দই সহজে সহ্য করতে পারেন। কারণ দই তৈরির সময় দুধের ল্যাকটোজের একটি অংশ ভেঙে যায়।
তারপরও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। নিয়মিত এমন সমস্যা হলে দইয়ের পরিমাণ কমিয়ে দেখা যেতে পারে। সমস্যা অব্যাহত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অ্যাসিডিটি থাকলে সতর্কতা জরুরি
টক দইয়ের কারণে কারো কারো অম্বল বা বুক জ্বালার সমস্যা বাড়তে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই অম্লতা বা খাবার ওপরের দিকে উঠে আসার সমস্যা থাকলে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখে দই খাওয়া উচিত।
এক মাস খেলেই কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে?
টক দইয়ের জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। আর অন্ত্রের স্বাস্থ্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এক মাস টক দই খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে—এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি।
কীভাবে টক দই খাবেন
* সাধারণ ও চিনি ছাড়া টক দই বেছে নিন।
* একসঙ্গে বেশি না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান।
* দুপুরের খাবারের সঙ্গে বা দিনের অন্য সময়ে খেতে পারেন।
* রাতে খেলে কোনো অস্বস্তি না হলে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
* চাইলে দইয়ের সঙ্গে ফল, বাদাম বা বীজ যোগ করা যায়।
* বাজারের দই কেনার আগে উপাদান ও পুষ্টির তথ্য দেখে নিন।
তাহলে এক মাস প্রতিদিন টক দই খাওয়া যাবে?
সুস্থ একজন মানুষ পরিমিত পরিমাণে সাধারণ, চিনি ছাড়া টক দই প্রতিদিন খেতে পারেন। এতে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়ার মতো পুষ্টি পাওয়া যায় এবং এটি সুষম খাদ্যতালিকার একটি ভালো সংযোজন হতে পারে।
তবে টক দই কোনো জাদুকরি খাবার নয়। এটি খেলেই ওজন কমবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে কিংবা সব ধরনের হজমের সমস্যা দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
দই খাওয়ার পর নিয়মিত পেটের সমস্যা, অ্যালার্জির লক্ষণ বা অম্বল বাড়লে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এসি/আপ্র/২৫/০৮/২০২৬