ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের শরীর থেকে টিউমার সম্পূর্ণ দূর করতে সক্ষম নতুন ধরনের ত্রিমুখী কার্যক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইনজেকশন আবিষ্কারের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষামূলক প্রয়োগে পাওয়া ফলাফলকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকেরা।
১১টি দেশে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার আওতায় ইনজেকশনটি এমন রোগীদের দেওয়া হয়, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল বা চিকিৎসার পর আবার ফিরে এসেছিল এবং প্রচলিত চিকিৎসায় যাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না।
‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের এই ইনজেকশন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগীর টিউমারের আকার কমাতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণার ফল রোববার (৩১ মে) যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিশ্বের বৃহত্তম ক্যানসার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির বার্ষিক সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়েছে বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। গবেষকদের দাবি, ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেও একই ধরনের ইতিবাচক ফল মিলেছে।
ইনজেকশনটি তৈরি করেছে জনসন অ্যান্ড জনসন। বর্তমানে প্রায় ৬০টি পৃথক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। মলদ্বার, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের ওপরও এর পরীক্ষা চলছে।
গবেষকদের মতে, ইনজেকশনটি ক্যানসারের বিরুদ্ধে তিনভাবে কাজ করে। প্রথমত, এটি ইজিএফআর নামের একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি জৈবিক পথ বন্ধ করে দেয়, যা ব্যবহার করে অনেক ক্যানসার কোষ চিকিৎসার প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।
এই চিকিৎসা থেকে উপকার পাওয়া রোগীদের একজন ৫৬ বছর বয়সি কার্ল ওয়ালশ।
২০২৪ সালের মে মাসে তার জিভের ক্যানসার শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে কেমোথেরাপি ও রোগপ্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাতে কাক্সিক্ষত ফল মেলেনি। পরে তিনি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে পরিচালিত ‘ওরিগএএমআই-ফোর’ পরীক্ষায় অংশ নেন।
কার্ল বলেন, ‘আমি এখন চিকিৎসার ১৭তম ধাপে আছি। এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আমি খুবই সন্তুষ্ট।’
শিরায় না দিয়ে ত্বকের নিচে প্রয়োগযোগ্য এই ইনজেকশন রোগীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ ও সুবিধাজনক। প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর একবার এটি প্রয়োগ করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার। প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।
কার্ল ওয়ালশ জানান, চিকিৎসা শুরুর আগে ফোলা ও তীব্র ব্যথার কারণে তার কথা বলা এবং খাওয়া-দাওয়ায় গুরুতর সমস্যা ছিল। তবে ইনজেকশন নেওয়ার পর ফোলা ও ব্যথা অনেকটাই কমে গেছে। কেমোথেরাপির সময় যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল, তা-ও আর নেই। মাত্র দুই ধাপ চিকিৎসার পর থেকেই তার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং ছয় মাসের মধ্যে তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে সব ধরনের খাবার খেতে সক্ষম হন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সানা/ডিসি/আপ্র/৩১/৫/২০২৬