ভারতের মেডিকেল ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম এবং স্বচ্ছতার দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন ক্রমেই বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকারের জবাবদিহি, শিক্ষা সংস্কার এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে গত বুধবারও (২২ জুলাই) হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সমর্থকের সমাবেশ দেখা গেছে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। শুরুতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থাকলেও বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের পর আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে জরুরি শুনানি হয়নি: শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হলেও বুধবার জরুরি শুনানির অনুমতি দেননি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
আদালতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনজীবী পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রমাণ হিসেবে ভিডিও উপস্থাপনের অনুমতি চাইলে প্রধান বিচারপতি বলেন, “ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।” তিনি আইনজীবীকে সময় নষ্ট না করার পরামর্শ দেন।
এর আগে দিল্লি হাইকোর্টও একই ধরনের আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সংসদমুখী মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও লাঠিচার্জ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে এমন অভিযোগ উঠে এলেও সরকার বা পুলিশ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
রাহুলের তিন দাবি: নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা অনিয়ম ও কারচুপির শিকার হয়েছে।
রাহুল গান্ধীর দাবি, গত এক দশকে দেশটিতে ১৫২টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি তিনটি দাবি তুলে ধরেন-কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পুলিশি আচরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্য ক্ষমা।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ন্যায্য দাবি জানাচ্ছে; তাদের ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়।
সংসদে বিরোধীদের বিক্ষোভ: নিট ইস্যুতে বুধবার সংসদেও উত্তাপ ছড়ায়। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা কালো পোশাক পরে পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেন। কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের পর শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হতে পারে না।
বিরোধীদের দাবির মুখে সরকার সংসদের উভয় কক্ষে এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
দিল্লিতে নিরাপত্তা কড়াকড়ি, বন্ধ ১৬ মেট্রো স্টেশন: আন্দোলনের প্রভাবে দিল্লির স্বাভাবিক জনজীবনেও চাপ পড়েছে। নিরাপত্তার কারণে রাজধানীর ১৬টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে লোক কল্যাণ মার্গ, রাজীব চক, প্যাটেল চক, মান্ডি হাউস, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, আইটিও, খান মার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টেশন।
দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব স্টেশন বন্ধ থাকবে। তবে কয়েকটি স্টেশনে আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের পাশে সমর্থকেরা: যন্তর মন্তরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে সমর্থন আসছে। অনেকে অনলাইন খাবার সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার ও পানীয় পাঠাচ্ছেন।
ডেলিভারি কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি বিদেশ থেকেও যন্তর মন্তরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের অর্ডার দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন: নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার সংস্কার ও সংসদে আলোচনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। সূত্র: এএফপি, এনডিটিভি, এএনআই
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬