ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে হানা দেয় ইন্টার মিলান, খানিক পর আবারও। এমন আশানুরূপ শুরুর মাঝেই নিজেদের ওপর বিপর্যয় ডেকে আনে দলটি—তাও একবার নয়, দুইবার। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য উভয় পক্ষের আক্রমণেই ওঠে ঝড়।
ব্যবধান কমিয়ে লড়াই জমিয়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত হার এড়াতে পারেনি ইতালিয়ান দলটি। এই রোমাঞ্চকর জয় দিয়েই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিযান শুরু করল রেয়াল মাদ্রিদ।
সান্তিয়াগো বের্নাবেউয়ে মঙ্গলবার এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ২-১ গোলে জিতেছে জোসে মরিনিয়োর দল। কিলিয়ান এমবাপে স্বাগতিকদের এগিয়ে নেওয়ার পর ব্যবধান বাড়ান ফেদে ভালভের্দে, আর ইন্টারের একমাত্র গোলটি করেন কার্লোস আউগুস্তো।
উল্লেখ্য, তিন দিন আগে লা লিগায় রেয়াল বেতিসের বিপক্ষে হেরে যাওয়ায় কিছুটা হলেও বেকায়দায় ছিল রেয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচেও শুরুতে কিছুটা চাপে পড়ে যায় তারা, তবে ইন্টারের বারবার ভুলে সেই চাপ ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়। তবে দুই গোল হজম করার পরও ইন্টার যেভাবে একের পর এক আক্রমণ শাণিয়েছে, তাতে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াইয়ের উত্তাপ এতটুকুও কমেনি।
বল দখলে রাখা কিংবা আক্রমণ—দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল ইন্টার। ৬০ শতাংশের বেশি সময় বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে গোলের জন্য মোট ২১টি শট নিয়ে সাতটি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয় তারা। তবে থিবো কোর্তোয়ার দুর্দান্ত কিছু সেভ দ্বিতীয় গোল পেতে দেয়নি দলটিকে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, শুরুতে একটি মারাত্মক ভুল করলেও পরবর্তীতে গোলপোস্টে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন ইন্টারের গোলরক্ষক জোসেপ মার্তিনেসও। তাই তো নিজেদের নেওয়া ১৬টি শটের আটটি লক্ষ্যে রাখলেও শেষ পর্যন্ত আর গোলের দেখা পায়নি রেয়াল। ম্যাচ শুরু হতেই রেয়ালের ডি-বক্সে ভীতি ছড়ায় সেরি আয় গত তিন মৌসুমে দুইবারের শিরোপাজয়ী ইন্টার। ছয় গজ বক্সের মুখ থেকে মার্কাস থুরামের জোরাল ভলি আটকে দিয়ে দলকে বিপদে পড়তে দেননি কোর্তোয়া।
একাদশ মিনিটে আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন রেয়ালের এই গোলরক্ষক।
ডি-বক্সের বাইরে থেকে লাউতারো মার্তিনেসের শট ঝাঁপিয়ে আটকে দেন কোর্তোয়া। এরপরই প্রতিপক্ষের একটি ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায় রেয়াল। চতুর্দশ মিনিটে নিজেদের ডি-বক্সের সামনে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সফরকারীরা, আর সেই সুযোগে দ্রুত ডি-বক্সে একটি থ্রু বল বাড়ান ব্রাহিম দিয়াস। ছুটে গিয়ে প্রথম স্পর্শেই শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন এমবাপে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এটি তার ৭১তম গোল।
প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় স্প্যানিশ কিংবদন্তি রাউল গন্সালেসের সঙ্গে যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছেন এমবাপে। এর দুই মিনিট পর আরেকটি দারুণ সেভ করেন কোর্তোয়া, হাকান কালহানোগ্লুর জোরাল শট ঠেকিয়ে দিয়ে বিপদ এড়ান এই বেলজিয়ান গোলরক্ষক। এর কিছুক্ষণ পরই আরও বড় ভুল করে বসেন ইন্টারের গোলরক্ষক, আর তাতেই দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে দলটি।
২৩তম মিনিটে সতীর্থের কাছ থেকে একটি ব্যাকপাস পান জোসেপ মার্তিনেস, তখন পর্যন্ত কোনো ধরনের হুমকিই ছিল না তাদের ওপর। ঠিকঠাকভাবে বল পায়েও নেন এই স্প্যানিশ গোলরক্ষক, তবে এরপরই চোখের পলকে ঘটে যায় অঘটন—খুব দ্রুতগতিতে ছুটে আসেন ভালভের্দে, আর মুহূর্তের জন্য যেন হতবিহ্বল হয়ে পড়েন মার্তিনেস। তার পায়ে থাকা বলই টোকা দিয়ে জালে পাঠিয়ে দেন এই রেয়াল মিডফিল্ডার। এর চার মিনিট পর ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।
গতিময় এক আক্রমণে ভিনিসিউস ও দিয়াসের পা ঘুরে বল পায়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন এমবাপে, তবে তার শট নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দারুণ এক ট্যাকলে বিপদ বাড়তে দেননি ডিফেন্ডার ইয়ান বিসেক। বিরতির ঠিক আগে মুহূর্তের ব্যবধানে একাধিক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে রেয়াল। একাধিক ডিফেন্ডারের চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে গোলমুখ থেকে শট নেন এমবাপে, তবে সেটি কোনোমতে পা দিয়ে আটকে দেন মার্তিনেস।
এরপর আলগা বলে ছুটে গিয়ে জুড বেলিংহ্যামের নেওয়া শটও রুখে দেন এই গোলরক্ষক। এরপরও ইন্টারের বিপদ পুরোপুরি কাটেনি, বল চলে যায় দূরের পোস্টে, তবে সেখানেও সফল হতে পারেননি দিয়াস। বিরতির পর খেলা পুনরায় শুরু হতেই আবার আক্রমণ শাণায় রেয়াল। দারুণ ক্ষিপ্রতায় বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছে যান এমবাপে, তবে শট নিতে সামান্য দেরি করে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে শট নিলেও তা দৃঢ়তার সঙ্গে আটকে দেন গোলরক্ষক মার্তিনেস।
৫৬তম মিনিটে দুর্দান্ত দুটি সেভ করেন কোর্তোয়া, যদিও পরক্ষণেই ওঠে অফসাইডের পতাকা। এর ঠিক পরপরই অবিশ্বাস্য এক সেভ করে দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখেন মার্তিনেস। ডি-বক্সে অসাধারণ নৈপুণ্যে দুইজনকে কাটিয়ে বাইলাইনের কাছ থেকে দূরের পোস্টে বল বাড়ান দিয়াস।
বুক দিয়ে বল নামিয়ে শট নেন বেলিংহ্যাম, দিয়াসকে আটকাতে আগেভাগেই সেদিকে এগিয়ে যাওয়া মার্তিনেস দ্রুত ছুটে এসে পা দিয়ে কোনোমতে সেটি আটকান।
ফিরতি বল ছয় গজ বক্সের মুখে পেয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হেড করেন ডামফ্রিস। এরপরের কয়েক মিনিটে দুই পক্ষই দুর্দান্ত কিছু সুযোগ তৈরি করলেও দুই গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে স্কোরলাইনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ৬৪তম মিনিটে আলেস্সান্দ্রো বাস্তোনির জোরাল শট ঝাঁপিয়ে আটকে দেন কোর্তোয়া। এর দুই মিনিট পর মাঝমাঠে আবার বলের নিয়ন্ত্রণ হারায় ইন্টার, আর দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে শট নেন এমবাপে, যা রুখে দেন মার্তিনেস।
৬৮তম মিনিটে দারুণ পাসিং ফুটবলের প্রদর্শনীতে আবারও ভীতি ছড়ায় রেয়াল। বেলিংহ্যাম থেকে ভিনিসিউস, তার কাছ থেকে এমবাপে হয়ে বল পৌঁছায় দিয়াসের কাছে, যিনি ডি-বক্সের ডান দিকে জায়গা খুঁজে নেন। একজনকে কাটিয়ে জায়গা তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত শটটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি।
একাধিক সুযোগ হাতছাড়া করার পর, ৭৭তম মিনিটে অবশেষে গোলের দেখা পায় ইন্টার। বিসেকের পাস ডি-বক্সে পেয়ে ডান দিকের বাইলাইন থেকে কাটব্যাক করেন লাউতারো মার্তিনেস, আর প্রথম স্পর্শেই জোরাল শটে ব্যবধান কমান আউগুস্তো।
নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগের মিনিটে আবারও গোলের কাছাকাছি চলে যায় ইন্টার। মিখিতারিয়ানের জোরাল শটে বল একজনের পায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করে লক্ষ্যেই ছুটছিল, তবে দারুণ নৈপুণ্যে সেটি আটকে দিয়ে দলকে জয়ের পথে ধরে রাখেন কোর্তোয়া।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, গত শনিবার সেরি আয় নাপোলির বিপক্ষে দুই গোল হজম করেও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নিয়েছিল ইন্টার। এবারও দারুণ পারফরম্যান্স দেখালেও একই ধরনের প্রত্যাবর্তনের গল্প আর লিখতে পারেনি তারা, বরং চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো হারের তেতো স্বাদ পেল ইতালিয়ান জায়ান্টরা।
ডিসি/আপ্র/০৯/০৯/২০২৬