যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে ইরানের ওষুধ খাত। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্যান্সারসহ জটিল রোগের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।
ইরান ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র হাদী আহমাদী জানিয়েছেন, দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৮০০ ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসাপণ্যের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০টি জীবনরক্ষাকারী ও অত্যন্ত জরুরি ওষুধ। ঘাটতিতে থাকা পণ্যের অন্তত ৪০০টি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না।
দুষ্প্রাপ্যতার পাশাপাশি ওষুধের দামও ব্যাপক বেড়েছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মৃগীরোগ ও স্নায়ুর ব্যথার ওষুধ গ্যাবানোটিনের দাম ২২০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে প্যারাসিটামলজাতীয় এসিটামিনোফেনের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ, অ্যান্টিবায়োটিক অ্যামোক্সিসিলিনের ২৮৫ শতাংশ এবং বিষণ্নতার ওষুধ ফ্লুওক্সেটিনের দাম ১০০ শতাংশ। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যাবশ্যক ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ছয় গুণ পর্যন্ত।
ইরানের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও এ সংকটকে আরো তীব্র করেছে। গত আগস্টে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের দাম এক বছরের ব্যবধানে ১২৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে ইরান। তবে কাঁচামাল ও কিছু দুর্লভ ওষুধের ক্ষেত্রে দেশটিকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং এবং সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানবিক ছাড় থাকা সত্ত্বেও ওষুধ আমদানির ব্যয় বেড়েছে।
এর মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলায় ইরানের প্রায় ৪৪টি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ জন কর্মী হতাহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তৌফিক দারু। প্রতিষ্ঠানটি ইরানের বৃহত্তম পেনশন তহবিলের মালিকানাধীন। তৌফিক দারুর বিক্রয় পরিচালক মারিয়াম ফারাহানি জানান, হামলায় গবেষণা, পেপটাইড ও ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ তৈরির প্রধান উৎপাদন লাইন পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ২৬ বছরের গবেষণার তথ্য ও বিশেষায়িত সরঞ্জামও নষ্ট হয়েছে। আংশিকভাবে উৎপাদন পুনরায় চালু করতেও অন্তত দুই বছর এবং কোটি কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছিল, তৌফিক দারু ফেনটানিল সরবরাহ করত, যা রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণায় ব্যবহার করা হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারে অ্যানাস্থেশিয়ার জন্য অনুমোদিত অল্প পরিমাণ সাইট্রেট-সল্ট ফর্মের ফেনটানিল তারা উৎপাদন করত।
সংকটের মধ্যেও ইরানি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করছে। দেশটির খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রধান মেহেদী পীরসালেহী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওষুধ সংকট নিয়ে অতিরঞ্জিত ও অপপ্রচারমূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ওষুধ উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে স্থানীয় চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তেহরানের এক পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞের মতে, ওষুধ আমদানিতে সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং বীমা কোম্পানিগুলোর ফার্মেসিগুলোর কাছে বিপুল বকেয়া পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। তাঁর দাবি, বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৮ কোয়াড্রিলিয়ন ইরানি রিয়াল, যা প্রায় ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের সমান।
ওই চিকিৎসক আরো সতর্ক করে বলেন, সামুদ্রিক অবরোধের কারণে রোটাভাইরাস ও ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকার মতো প্রতিরোধমূলক টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হলে জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের কারণে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রকোপও বাড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসি/আপ্র/০৯/০৯/২০২৬