ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে সমঝোতাটি কার্যকর হতে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থাকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সম্ভাব্য এই সমঝোতাকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাতারে দুই দেশের আলোচকদের মধ্যে হওয়া আলোচনায় যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং আঞ্চলিক সংঘাত নিরসয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের তথ্যমতে, দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক প্রস্তুত হয়েছে, যার আওতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বহাল রাখা এবং পরবর্তী সময়ে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির দিকে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো এতে সই করেননি। বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছেন।
সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। চুক্তি অনুযায়ী, এই নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ অবাধ থাকবে। কোনো ধরনের টোল আরোপ বা জাহাজ হয়রানি করা হবে না। একই সঙ্গে ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালি থেকে সব সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে হবে।
তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তারা প্রণালির সার্বভৌমত্ব ছাড়তে রাজি নয়। তেহরান ও ওমানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে, নতুন কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা টোল আরোপের চেষ্টা হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সমঝোতা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার অগ্রগতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ তুলে নেবে। পাশাপাশি ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে। ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল ছাড় এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কার্যপদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হবে।
পারমাণবিক ইস্যুতেও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার রাখা হয়েছে। সমঝোতা স্মারকে ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যুদ্ধবিরতির ৬০ দিনের মধ্যেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানির খবরও পাওয়া গেছে। ইরান বুশেহর অঞ্চলে শত্রুপক্ষের ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। একই সঙ্গে হরমুজের কাছে কয়েকটি জাহাজকে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরানি বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক উপস্থিতি ও নৌ অবরোধ বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে দুই পক্ষই এখন একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়ার চাপ অনুভব করছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনার সময় ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক—সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ খোলা থাকবে।
জাতিসংঘ দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হরমুজ অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, অ্যাক্সিওস
সানা/আপ্র/২৯/৫/২০২৬