পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকার গঠনের পর দায়িত্ব নিয়েই একের পর এক কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সীমান্তনীতি, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, প্রশাসনিক রদবদল ও সরকারি সুবিধা বণ্টনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নতুন সরকার প্রশাসনিক পদক্ষেপের আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে চাইছে।
নির্বাচনের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের দাবি, বিজেপি সরকার গঠনের প্রথম সপ্তাহেই তাদের কর্মীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ১২ মে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করেন এবং সহিংসতা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেন।
এদিকে নবান্নে সংবাদ সম্মেলন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলসহ তিন জ্যেষ্ঠ আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের ঘোষণা দেন। আরজি কর হাসপাতাল-সংক্রান্ত ঘটনা সঠিকভাবে সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে এ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিরোধীরা এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখছে।
সিপিআই-এমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম প্রশ্ন তুলেছেন, আরজি কর মামলার তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই বড় কোনো ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করতে পারেনি, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। তার মতে, প্রশাসনিক শুদ্ধির নামে বাছাই করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গত ১২ মে কলকাতার তিলজলার একটি চামড়া কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিক নিহত ও পাঁচজন আহত হন। ঘটনার পরদিনই ভবনটিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত ঘিরেও ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, ভবনের মালিকপক্ষকে কাগজপত্র উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া সুশাসনের উদাহরণ হতে পারে না। একইসঙ্গে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।
এর মধ্যে ১৩ মে জনসমক্ষে পশু কোরবানি নিষিদ্ধ করে নতুন নির্দেশনা জারি করে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি রাস্তা বন্ধ করে নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন এবং মন্দির-মসজিদসহ উপাসনালয়ে উচ্চস্বরে লাউডস্পিকার ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, জনশৃঙ্খলা ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারি সুবিধা বণ্টনসংক্রান্ত নতুন সিদ্ধান্তকে ঘিরে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে যাদের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়বে, তারা রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না।
বিরোধীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহু মানুষের নাম বাদ দিয়ে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। একইসঙ্গে রেশন কার্ড যাচাইয়ের নামে ‘অ-ভারতীয়’ শনাক্তের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই শুভেন্দু সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ও বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সানা/আপ্র/১৬/৫/২০২৬