প্রত্যাশিত জয় শেষে প্রতীক্ষিত সেই ক্ষণ। শনিবার (৯ মে) সকালে ব্রিগেডের ঐতিহাসিক ময়দানে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজভবনের বদলে খোলা ময়দানে মানুষের সামনে শপথ নেওয়ার এই নজিরবিহীন অনুষ্ঠানে সাক্ষী থাকলো কয়েক লাখ মানুষ। রাজ্যপাল আর এন রবির উপস্থিতিতে বঙ্গ রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
গতকাল শনিবার (৫ মে) সকাল থেকেই কলকাতার চেহারা ছিল উৎসবমুখর। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশেষ বিমানে কলকাতা পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আর বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে নিয়ে হুডখোলা জিপে ব্রিগেডে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ব্রিগেডের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা এনসিপি নেতা প্রফুল পটেল, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরি, চিরাগ পাসোয়ান, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নড্ডা, স্মৃতি ইরানি, শিবরাজ সিংহ চৌহান, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবীস, অগ্নিমিত্রা পাল, মিঠুন চক্রবর্তী-সহ কেন্দ্র ও রাজ্য বিজেপির শীর্ষনেতারা।
ব্রিগেডের মঞ্চে শ্যামাপ্রসাদের সহযোগী মাখনলাল সরকারকে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। প্রধানমন্ত্রী প্রণাম করেন ৯৭ বছর বয়সের মাখনলাল সরকারকে। ১৯৫২ সালে যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মিরে ভারতীয় ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলনের আন্দোলন করছিলেন, তখন মাখনলাল সরকার তার সঙ্গে ছিলেন এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি শপথের পর শুভেন্দু অধিকারীকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাকে গলায় মালা পরিয়ে দেন।
ভোর থেকেই জেলা থেকে আসা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ও আবেগে ভেসে যাচ্ছিল কলকাতা। সকাল থেকেই গোটা পশ্চিমবঙ্গ যেন ভেঙে পড়েছিল কলকাতার রাজপথে। শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশন থেকে মিছিলে মিছিলে ছেয়ে যায় ময়দান চত্বর। মিহিদানা, মিষ্টি দই এবং রসগোল্লার স্টল করা হয়েছিল ব্রিগেডে। বাড়তি ভিড় ছিল ঝালমুড়ির স্টলে। কোচবিহার থেকে আসা বিজেপির একনিষ্ঠ কর্মী বিমল বর্মন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমরা এই দিনটার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি। উত্তরবঙ্গের মানুষের দাবি এবার মর্যাদা পাবে। জঙ্গলমহল থেকে আসা সুমিতা মাহাতো বলেন, শুভেন্দুদা আমাদের ঘরের ছেলে। আজ উনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন।
বীরভূম ও বাঁকুড়া থেকে আসা সমর্থকরা মাদল ও ধামসা নিয়ে ব্রিগেডের পথে বর্ণাঢ্য মিছিল করেন। এ দিন বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের সাধুসন্তরাও।
মঞ্চের আশেপাশে থাকা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের চোখেমুখে ছিল জয়ের তৃপ্তি। পুরুলিয়ার এক জেলা স্তরের নেতা বলেন, এটা শুধু রাজনৈতিক জয় নয়, এটা সাধারণ মানুষের জয়।
অনেক কর্মীকেই দেখা যায় মেদিনীপুর ও কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বিতরণ করতে। সমর্থকদের অনেকেরই দাবি, পিসি-ভাইপোর শাসনের অবসান ঘটিয়ে এবার রাজ্যে আসল পরিবর্তন এলো।
নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়ে শুভেন্দু অধিকারী এ দিন তার মন্ত্রিসভার প্রথম পাঁচ সদস্যকে নিয়ে শপথ নিলেন। তার সঙ্গে শপথ নিয়েছেন– দিলোীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রামাণিক।
শপথ নেওয়ার পর জনতার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই ভিড়ই বলে দিচ্ছে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। আমার সরকারের প্রথম কাজ হবে রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি ঘরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। ভয়মুক্ত ও তোষণমুক্ত বাংলা গড়াই আমাদের লক্ষ্য।
সানা/আপ্র/৯/৫/২০২৬