কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পড়েছে জাপান। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ ঘিরে দেশজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ, বিভক্ত হচ্ছে জনমত। অস্ত্র রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিদেশে জাপানের সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বিস্তারের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজধানী টোকিওসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
টোকিওর রাস্তায় বৃষ্টিভেজা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীদের অনেকের স্লোগান ছিল-‘আর যুদ্ধ নয়’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা শান্তিবাদী রাষ্ট্রচিন্তা থেকে জাপান সরে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
গত বছরের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তার সরকার বলছে, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় এ পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে চীনের আগ্রাসী অবস্থান, উত্তর কোরিয়ার অস্থিতিশীলতা এবং রাশিয়ার যুদ্ধংদেহী মনোভাব জাপানের নিরাপত্তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও জাপানকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহ দিচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সংবিধানের ধারা ৯-এ যুদ্ধকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে অস্বীকার করা হয় এবং যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনী গঠনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে এর ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এনে আত্মরক্ষা বাহিনী গঠনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তাকাইচি সরকার সংবিধানের শান্তিবাদী অবস্থানের বিপরীতে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নেয়। সরকারের ভাষ্য, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় মিত্র দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই জাপানে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরালো হতে শুরু করে। টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে বয়স্কদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক তরুণও অংশ নেন। বিক্ষোভকারী আকারি মায়েজোনো বলেন, জনগণের মতামত ছাড়াই এমন পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, সংবিধানের ধারা ৯-ই জাপানকে অতীতের বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেছে। এই ধারা দুর্বল হয়ে গেলে ভবিষ্যতে দেশটি বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া জাপানিদের ‘হিবাকুশা’ বলা হয়। তাদের একজন জিরো হামাসুমি সম্প্রতি জাতিসংঘে বলেন, “পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে কারণ আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আর যুদ্ধ নয়, আর হিবাকুশা নয়।”
বিক্ষোভকারীদের মতে, ধারা ৯ শুধু একটি সাংবিধানিক বিধান নয়; এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অতীত থেকে জন্ম নেওয়া একটি নৈতিক অঙ্গীকার।
তবে জাপানের ভেতরে এ ইস্যুতে মতভেদও গভীর। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, একাংশ শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় জাপানকে আত্মরক্ষায় আরো প্রস্তুত হতে হবে এবং মিত্রদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তারা মনে করেন, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই শান্তিবাদ ত্যাগ নয়, বরং অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকার কৌশল।
অন্যদিকে বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন, সামরিকীকরণের এই ধারা জাপানের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে ফাঁপা করে দেবে এবং দেশটিকে বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলবে।
টোকিওর এক দোকানকর্মী বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করে বলেন, “এখন নতুন জাপানের সময়।”
অতীতের যুদ্ধবিধ্বস্ত অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা শান্তিবাদী পরিচয় ধরে রাখা, নাকি পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ-এই দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতার মধ্যেই এখন ভবিষ্যতের পথ খুঁজছে জাপান।
সানা/আপ্র/৯/৫/২০২৬