ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ী নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে নির্বাচিত করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তার নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেবে। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।
দলীয় বিধায়কদের নিয়ে শুক্রবার (৮ মে) কলকাতার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারীকে বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের জন্য আটটি প্রস্তাব আসে। সব প্রস্তাবেই একটিই নাম ছিল। দ্বিতীয় নামের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হলেও কোনো বিকল্প নাম আসেনি।
নিয়ম অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিষদীয় দলনেতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন।
গত বিধানসভা নির্বাচনে মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফল প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে এবং বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য দল মিলে ৬টি আসনে জয়ী হয়। একটি আসনে পুনর্র্নিবাচনের কথা রয়েছে।
বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে অমিত শাহের নেতৃত্বে এবং ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝির সহযোগিতায় বিধায়কদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর শুভেন্দু অধিকারীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
গত পাঁচ বছর বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর-দুইটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জয়ী হন এবং ভবানীপুরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারী ২০২০ সালের শেষ দিকে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তিনি দলের প্রধান মুখ হিসেবে উঠে আসেন।
বিজেপির ভেতরে শুরুতে কিছুটা জল্পনা থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচনে হারানো এবং নির্বাচনী সাফল্যের কারণে শুভেন্দুর দাবি অগ্রাহ্য করার সুযোগ ছিল না দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।
এদিকে নতুন মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী পদ থাকবে কি না তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে, দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করা হতে পারে। এর মধ্যে একজন নারী নেত্রী হিসেবে অগ্নিমিত্রা পাল এবং উত্তরবঙ্গ থেকে শঙ্কর ঘোষের নাম আলোচনায় রয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
অমিত শাহ বললেন ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নপূরণে কাজ করবে নতুন সরকার: পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, নতুন সরকার ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নপূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। শুক্রবার বিজেপির বিধায়ক দলের নেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম চূড়ান্ত করার পর তাকে অভিনন্দন জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম দলগুলোকে পরাজিত করে বিজেপিকে ম্যান্ডেট দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ধন্যবাদ জানান অমিত শাহ। তিনি বলেন, জনগণের এই আস্থার মর্যাদা দিয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে তাদের লক্ষ্য।
বিজেপির বিধায়ক দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীকে সংবর্ধনা দেন অমিত শাহ। এরপরই তিনি ঘোষণা করেন, শুভেন্দু অধিকারীই হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
ভয় দূর করে ভরসার বার্তা শুভেন্দুর: পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর রাজ্যের মানুষের প্রতি আশ্বাসের বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার কলকাতার বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে নবনির্বাচিত বিধায়কদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, এখন সময় “ভয় আউট, ভরসা ইন”। একই সঙ্গে তিনি নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং “সোনার বাংলা” গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুভেন্দু অধিকারীকে বিজেপির বিধায়ক দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পথ সুগম হয়।
ভাষণে শুভেন্দু অধিকারী অমিত শাহকে “আধুনিক ভারতের চাণক্য” হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, বিজেপি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী এবং ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পূরণ করা হবে।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই জয়ের মাধ্যমে রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শুভেন্দু।
তিনি বলেন, অমিত শাহের নেতৃত্বে রাজ্যে ভয়মুক্ত পরিবেশ গড়ে উঠেছে এবং প্রধানমন্ত্রী ভরসা দিয়েছেন। এখন লক্ষ্য নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উন্নত, সমৃদ্ধ “সোনার বাংলা” গঠন।
নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়ী হন। এর মধ্যে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভবানীপুর আসনে পরাজিত করা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি তিনি নন্দীগ্রাম আসনেও জয়ী হন।
শুভেন্দুর এই সাফল্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে “যোদ্ধা” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, নানা বাধা অতিক্রম করে তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিজেপি কর্মীদের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতারা শুভেন্দু অধিকারীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ উন্নয়নের নতুন পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
সানা/আপ্র/৮/৫/২০২৬