দেড় বছর ধরে স্থবির হয়ে থাকা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে সতর্ক ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ৪০টির বেশি প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে সক্রিয় করার মাধ্যমে সম্পর্কের গতি ফেরাতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে এগোবে। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকবে দুই দেশের জনগণের কল্যাণ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। গত দেড় বছরে স্থবির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা পুনরুদ্ধারে দুই পক্ষের মধ্যে ‘সাধারণ বোঝাপড়া’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব স্পষ্ট করে বলেন, অতীতে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রকৌশলে ভারত সমর্থন বা সহযোগিতা করেনি। তাঁর ভাষায়, ভারত সব সময় বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে কাজ করে এসেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিককে সেবা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির বিষয় দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে না। একই সঙ্গে তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যান তিনি।
পানি বণ্টন প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি জানান, প্রায় তিন দশক আগে করা গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করেছে এবং নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই এর নবায়ন হবে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি আগাম কোনো মন্তব্য করতে চাননি, তবে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানান। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি সংস্থার বৈঠক শিগগিরই হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে প্রত্যাশিত ফল না আসায় সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিস্তারকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বিমসটেককে সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ এই সংস্থার সভাপতির দায়িত্বে থাকায় সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, তা বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ যেন দুই দেশের ইতিবাচক উদ্যোগকে ব্যাহত না করে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় লোকজন ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে কয়েক বছর ধরে প্রায় তিন হাজার সন্দেহভাজন ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাইয়ের বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। সীমান্তে সাপ বা কুমির ছেড়ে দেওয়ার খবরকে তিনি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে স্বল্প সুদের ঋণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে সে অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নিতে ভারত প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করার জন্য কাজ চলছে বলে উল্লেখ করেন।
জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অপরিশোধিত নয়, পরিশোধিত তেলের প্রয়োজন মেটাতে ভারত সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
সব মিলিয়ে দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—ঢাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে, তবে তা হবে ধীরে, বাস্তবসম্মতভাবে এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে।
সানা/আপ্র/৭/৫/২০২৬