যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে, যা রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি তরুণ ভোটার তাঁর প্রতি সমর্থন জানালেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ইউগভ-দ্য ইকোনমিস্ট পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের সমর্থন ছিল ৪৮ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা কমে ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে তাঁর সমর্থন সূচকও ইতিবাচক অবস্থা থেকে নেমে মাইনাস ২৭ থেকে মাইনাস ৪৭-এ পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা তরুণদের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রধান কারণ। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা তাঁদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ৩০ বছরের কম বয়সী ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।
তরুণদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউসে ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং শুল্কনীতির মতো বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাবে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম আরো বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও হতাশা বাড়ছে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মসংস্থানের গতি কমেছে। অনেক তরুণের অভিযোগ, চাকরির বাজার ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একাধিক ক্ষেত্রে শতাধিক আবেদন করেও সাক্ষাৎকারের সুযোগ না পাওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমস–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিগ্রিধারী তরুণদের জন্য চাকরির বাজার এখন মহামারির পর সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর মাসিক গড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি নেমে এসেছে প্রায় ২৬ হাজারে, যা জো বাইডেন–এর মেয়াদের শেষ সময়ের তুলনায় অনেক কম। একই সময়ে কারখানাখাতে ৮২ হাজার চাকরি কমে গেছে।
অর্থনৈতিক সূচকগুলোও তরুণদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত এক বছরে কফির দাম ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, গরুর মাংসের দাম ১২ দশমিক ১ শতাংশ এবং সবজির দাম ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও বিদ্যুতের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানে সামরিক পদক্ষেপের পর জ্বালানি তেলের দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
শিক্ষা খাতেও প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজ শিক্ষাকে সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিলেও টিউশন ফি বেড়েছে এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ব্যয় কমেনি; বরং নতুন নীতির কারণে স্বাস্থ্যবিমা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কোটি মানুষ।
রাজনৈতিক আচরণও তরুণদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিরতা তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
হার্ভার্ড ইয়ুথ পোল-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সঠিক পথে এগোচ্ছে; বিপরীতে ৫৭ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে চলছে। মাত্র ৩০ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন, তাঁরা তাঁদের অভিভাবকদের চেয়ে ভালো আর্থিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন।
তরুণদের মনোভাব নিয়ে গবেষক র্যাচেল জানফাজা মনে করেন, মূল প্রশ্ন হলো-বর্তমান নেতৃত্ব তরুণদের জীবনমান উন্নত করছে কি না। তাঁর মতে, অনেক তরুণই মনে করছেন, এই ক্ষেত্রে প্রশাসন ব্যর্থ।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, তরুণ ভোটারদের এই পরিবর্তিত মনোভাব ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের জন্য তা ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/৪/৫/২০২৬