গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬

মেনু

সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা নেই ট্রাম্পের, পাল্টাপাল্টি দাবিতে আরো ঘনীভূত সংকট

ইরান যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে নতুন মোড়

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:১৫ পিএম, ২০ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৪৫ এএম ২০২৬
ইরান যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে নতুন মোড়
ছবি

গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প -ছবি রয়টার্স

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক উত্তেজনা চতুর্থ সপ্তাহে গড়াতেই সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। একই সময়ে ইরান দাবি করেছে, তারা মার্কিন যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রণালয়েও ড্রোন আঘাত হেনেছে। পাল্টা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের পক্ষে হস্তক্ষেপ করা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে জার্মানি। সব মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও অনিশ্চয়তা ও চাপ দ্রুত বাড়ছে।

সেনা পাঠানো নিয়ে ট্রাম্পের স্পষ্ট ইঙ্গিত

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, যদি পাঠাতেনও, তা আগেভাগে জানাতেন না; তবে এখন সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। ইরানের অস্ত্র কর্মসূচি নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত যাবে, তা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই এ মন্তব্য করেন তিনি। গত গ্রীষ্মে পরিচালিত এক সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কিছু পারমাণবিক সরঞ্জাম চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর সেগুলো জব্দ করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

হোয়াইট হাউসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও ট্রাম্প একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। সেখানে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা মোতায়েনের চিন্তা তিনি করছেন না; যুক্তরাষ্ট্র কেবল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই নেবে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথও জানিয়েছিলেন, এই যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের কাছে আরো অর্থ চাওয়া হবে।

মার্কিন যুদ্ধবিমানে হামলার দাবি ইরানের

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে জানানো হয়েছে, দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে—ইরানের মধ্যাঞ্চলের আকাশে মার্কিন বাহিনীর একটি কৌশলগত যুদ্ধবিমানে তারা আঘাত হেনেছে। এ দাবির সঙ্গে একটি ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তথ্যটি নিশ্চিত হলে এটি হবে চলমান যুদ্ধে মার্কিন এমন যুদ্ধবিমানে হামলার প্রথম ঘটনা।

ইসরায়েলের মন্ত্রণালয়ে ড্রোন হামলার দাবিও তেহরানের

এর আগে ইরান দাবি করে, পশ্চিম জেরুজালেমে অবস্থিত ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তারা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের, কয়েক ডজন নাবিককে হত্যার ঘটনা এবং গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। বিবৃতিতে যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’র সদস্যদের রক্তের বদলার কথাও বলা হয়। তবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির পরিমাণ তখনও স্পষ্ট হয়নি।

গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে তেহরান। ইরানের দাবি, ভারতে মহড়া শেষে দেশে ফেরার পথে ওই যুদ্ধজাহাজে মার্কিন হামলায় দেশটির নৌবাহিনীর ৮০ জনের বেশি সদস্য নিহত হন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের এক বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব নিহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।

নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানের সক্ষমতা ভেঙে পড়েছে

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, টানা ২০ দিন ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, ইরান এখন আর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারছে না। তবে এসব দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পুরো বিশ্বকে রক্ষা করছে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং যেসব কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির সরঞ্জাম তৈরি হয়, সেগুলোও ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি নির্মূল করা।

স্থল অভিযানের ইঙ্গিত, অভিযোগ অস্বীকার

নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের জনগণ যাতে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করাও এ অভিযানের একটি উদ্দেশ্য। তবে সরকার পতনের দাবিতে ইরানের জনগণ রাস্তায় নামবেন কি না, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি বলেও জানান তিনি। যুদ্ধ এখনো মূলত আকাশপথে সীমিত থাকলেও স্থল অভিযানের বিকল্পও তাদের হাতে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন নেতানিয়াহু, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে টেনে আনার অভিযোগও নাকচ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কী করতে হবে, তা অন্য কেউ বলে দিতে পারে—এমন ধারণা অবাস্তব। ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অবস্থান বদল জার্মানির

গাজায় জাতিগত হত্যা চালানোর অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলায় ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছে জার্মানি। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা মামলা দায়েরের পর জার্মানি ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলেও প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দ্য হেগের মামলায় বার্লিন আর ইসরায়েলের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে না। বিষয়টি দেশটির অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিশুহত্যা ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

মানবিক পরিস্থিতিও আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ২০৪ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম। এ ছাড়া দুজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, এ যুদ্ধে ১৮ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

গত ৮ মার্চ থেকে চালানো বিমান হামলায় ৪৯৮টি স্কুল, ২৫১টি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ১৭টি রেড ক্রিসেন্ট কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বেসামরিক মানুষের ব্যবহার্য ৭০ হাজারের বেশি স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মানবাধিকারবিষয়ক সক্রিয় সংস্থাগুলোকে এ পরিস্থিতিতে নীরব না থাকার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।

আরব মিত্রদের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন

আরব মিত্রদের কাছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে কংগ্রেসে পাঠানো এক নোটিশে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৮০০ কোটি ডলারের বেশি সমমূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রি করা হবে। কুয়েতের জন্যও ৮০০ কোটি ডলার সমমূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জর্ডানের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৭ কোটি ডলারের বিমান ও গোলাবারুদ সহায়তা। এ ছাড়া ওই তিন দেশের কাছে আরো ৬০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয়ের অনুমোদনের কথাও জানানো হয়েছে।

সংকট আরো বিস্তৃত ও জটিল

সব মিলিয়ে চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানো এই যুদ্ধে ট্রাম্পের সেনা না পাঠানোর ইঙ্গিত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও পাল্টাপাল্টি হামলার দাবি, বাড়তি অস্ত্র বিক্রি, আন্তর্জাতিক আদালতে অবস্থান পরিবর্তন এবং দ্রুত অবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরো জটিল ও বিস্তৃত করে তুলছে।

সানা/আপ্র/২০/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

আরব মিত্রদের কাছে ২৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র
২০ মার্চ ২০২৬

আরব মিত্রদের কাছে ২৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র

আরব মিত্রদের কাছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (১...

ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প
১৯ মার্চ ২০২৬

ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েল আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প

ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি অভিযানের সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম...

ছুটিতে প্রেমে পড়ার পরামর্শ, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
১৯ মার্চ ২০২৬

ছুটিতে প্রেমে পড়ার পরামর্শ, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

চীনের একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বসন্তকালীন ছুটিতে বইপত্র সরিয়ে রেখে প্রকৃতি উপভোগ এবং...

সৌদি আরবের আকাশে চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ শুক্রবার
১৮ মার্চ ২০২৬

সৌদি আরবের আকাশে চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ শুক্রবার

সৌদি আরবে আজ বুধবার (১৮ মার্চ) ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। এর ফলে আগামীকাল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই