মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ১৬তম দিনে প্রথমবারের মতো হাইপারসনিক সেজ্জিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে চালানো এই হামলাকে যুদ্ধের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময় হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি মন্ত্রীরা, আর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি শত্রু পক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
গত রোববার (১৫ মার্চ) ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভি জানায়, ‘ট্রু প্রমিজ-৪’ অভিযানের ৫৪তম ধাপে ইসরায়েলি ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে এই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে যুদ্ধের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলেও স্বীকার করেছেন ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
যুদ্ধের ১৬তম দিনে সেজ্জিল–২ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার: ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সেজ্জিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। ‘ইয়া জাহরা’ অপারেশন কোডের অধীনে পরিচালিত প্রতিশোধমূলক হামলায় দ্বৈত ওয়ারহেডসহ সুপার-হেভি খোররামশাহর, খায়বার, কদর ও এমাদসহ একাধিক ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েন করা হয়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের এরোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি এক বার্তায় সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তেল আবিব, হার্জলিয়া ও অধিকৃত অঞ্চলের অন্তত ১৪১টি স্থানে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ সেজ্জিল কী: সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ বলা হয়। এর আরেক নাম সাজ্জিল বা আশুরা। এটি ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি শক্তিশালী মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এটি সর্বোচ্চ দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং প্রায় সাতশ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। দুই স্তরের এই ক্ষেপণাস্ত্রে তরল জ্বালানির পরিবর্তে কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। উচ্চ আকাশে গতিপথ পরিবর্তনের বিশেষ ক্ষমতার কারণেই একে ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার, ব্যাস প্রায় ১ দশমিক ২৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ১২ হাজার ৬০০ কেজি। নব্বইয়ের দশকে এর উন্নয়ন শুরু করে ইরান এবং ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। সেজ্জিলের দুটি সংস্করণ রয়েছে-সেজ্জিল–১ ও সেজ্জিল–২। এর মধ্যে সেজ্জিল-২ মাঝারি পাল্লার।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে: ইসরায়েলি মন্ত্রী: ইসরায়েলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রী মিকি জোহার জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আরো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। ইসরায়েলের একটি রেডিও সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় উত্তেজনা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
যুদ্ধ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না: ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলা প্রত্যাশার চেয়ে সফল হলেও সামগ্রিক অগ্রগতি মন্থর বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী বড় ধরনের বিক্ষোভ হবে-এমন ধারণা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ফলে যুদ্ধের কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই হাজার দুইশ স্থানে হামলা চালানো হয়েছে।
মেহরাবাদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি: ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ব্যবহৃত একটি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর মতে, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ও সমন্বয়ের জন্য ব্যবহৃত এই বিমান ধ্বংস হওয়ায় ইরানের সামরিক যোগাযোগ সক্ষমতায় ধাক্কা লেগেছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার ক্ষতিপূরণ দাবি: ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি শত্রু পক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি বলেন, শত্রুরা ক্ষতিপূরণ না দিলে ইরান তাদের সমপরিমাণ সম্পদ ধ্বংস করবে। ৮ মার্চ বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্তে তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
তথ্য পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার ৫০০: ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলকে তথ্য সরবরাহের অভিযোগে পাঁচশ জনকে গ্রেফতার করেছে ইরানের পুলিশ। পুলিশ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদরেজা রাদান জানান, তাদের মধ্যে অন্তত আড়াইশ জনের বিরুদ্ধে বিদেশি গণমাধ্যমে তথ্য পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কয়েকটি আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যও গ্রেফতার হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি: মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। গত রোববার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম তিন শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৬ ডলার ছাড়ায়। সোমবার কিছুটা কমলেও প্রায় ১০৪ ডলারের বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ: যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। এখন সেখানে দিনে পাঁচটির বেশি জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তত ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
মিত্রদের সামরিক সহায়তা চাইলেন ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি সচল করতে মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে চীন, জাপান, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করানোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
চলমান হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত এক হাজার তিনশর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
সানা/আপ্র/১৬/৩/২০২৬