মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, অন্তত ১৫৩টি শহর আক্রান্ত হয়েছে, লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে ৫০৪টি স্থান এবং নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা পৌঁছেছে ১,০৩৯-এ। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।
তেহরানের প্রতিটি অংশে হামলা: রাজধানী তেহরানের ‘প্রতিটি অংশ’ হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিক মুহাম্মদ খাতিবি। তার ভাষ্য, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল টাওয়ার, সম্প্রচার কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর সীমিত কিছু উদযাপন দেখা গেলেও বড় ধরনের অস্থিরতা হয়নি। তবে সামরিক ও পুলিশ স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে বলে জানান তিনি।
খামেনি হত্যার পর নেতৃত্বে আঘাত: শনিবারের সমন্বিত হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিহত হন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান, সেনাবাহিনীর প্রধান এবং বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারও প্রাণ হারান।
এরপর ইসরায়েলি বাহিনী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ানের দপ্তর ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে দফায় দফায় বোমা হামলার কথা জানিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার কৌশলই এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
গোয়েন্দা সহযোগিতায় ‘নিখুঁত’ অভিযান: পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশকের নজরদারি ও সাম্প্রতিক গোয়েন্দা সমন্বয়ের ভিত্তিতে মাত্র ৬০ সেকেন্ডের সমন্বিত হামলায় খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন। ইসরায়েলি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তার সমন্বয় এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন-নেতৃত্ব অপসারণ দীর্ঘমেয়াদে আরো কঠোর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।
পারমাণবিক স্থাপনায় ক্ষতি, তেজস্ক্রিয় ঝুঁকি নেই: আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের প্রবেশ ভবনে ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে। তবে তেজস্ক্রিয় বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
লেবাননে সংঘাত, সীমান্তে অগ্রসর ইসরায়েল: ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতে লেবাননে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলায় ৫২ জন নিহত হয়েছেন।
সীমান্তের কয়েকটি অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে লেবাননের সেনাবাহিনী সরে গেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সীমান্তবর্তী বসতিতে হামলা ঠেকাতে লেবাননে আরো অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন ও জ্বালানি সংকট: সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ইরান এ হামলাকে ‘ছদ্মবেশী অভিযান’ বলে দাবি করেছে।
ওমানের ধোফার প্রদেশে দুটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে; আরেকটি সালালাহ বন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে।
কাতারে হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বেড়েছে। ভারতের কোম্পানিগুলো শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে এবং বিকল্প ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে।
পাকিস্তানে বিক্ষোভ, কূটনৈতিক উত্তেজনা: খামেনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেট ঘিরে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে আগামী ৬ মার্চ পর্যন্ত ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো।
যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন: ইরানে হামলায় যুক্তরাজ্যের সীমিত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তার সরকার ‘আকাশ থেকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে বিশ্বাস করে না’ এবং সিদ্ধান্তটি সচেতনভাবে নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ কতদূর গড়াবে? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধ বছরের পর বছর চলবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাল্টা হামলা, লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা, উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন আক্রমণ এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হচ্ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর না হলে আঞ্চলিক সংঘাত বৃহত্তর বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সানা/আপ্র/৩/৩/২০২৬