দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকলেও টিকাদান কর্মসূচির পরও কমছে না শিশুমৃত্যু। গত ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে অনেক শিশুর শরীরে টিকার পর প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। ফলে টিকা নেওয়ার পরও তারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে।
হামের বিস্তার ঠেকাতে সরকার গত এপ্রিলে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনসহ সারাদেশে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ২০ মে শেষ হওয়া এই কর্মসূচিতে এক কোটি ৮৩ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৪ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা নেওয়ার পর শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তবে অপুষ্টি, ডায়রিয়া, প্রোটিনের ঘাটতি ও দুর্বল শারীরিক অবস্থার কারণে অনেক শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি গঠনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে তারা সহজেই সংক্রমিত হচ্ছে এবং জটিলতায় মৃত্যুবরণ করছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, হামের টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়স ও পুষ্টির অবস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে অনেক শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হওয়ায় ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি জানান, মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুকে প্রাথমিকভাবে সুরক্ষা দেয়। গর্ভকালীন আইজিজি এবং বুকের দুধের মাধ্যমে পাওয়া আইজিএ অ্যান্টিবডি শিশুর রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও কম বুকের দুধ গ্রহণের কারণে এই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী আরও বলেন, ছয় মাস বয়সে দেওয়া টিকা প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। ৯ মাস বয়সে কার্যকারিতা বেড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং ১৫ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছে। প্রি-স্কুল বয়সে এই কার্যকারিতা প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার পর প্রথমে আইজিএম অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেওয়া আইজিজি অ্যান্টিবডি তৈরি হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। সব ধরনের অ্যান্টিবডিই প্রোটিননির্ভর হওয়ায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীরে এগুলো পর্যাপ্তভাবে তৈরি হয় না।
চিকিৎসকদের মতে, হামের জটিলতা হিসেবে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দিচ্ছে, যা শিশুমৃত্যুর বড় কারণ হয়ে উঠছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এফ এ আসমা খানম বলেন, যেসব মা আগে হামের টিকা নেননি, তাদের সন্তানরা গর্ভকাল থেকেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পাচ্ছে না। তাই গর্ভধারণের আগেই নারীদের টিকা নেওয়া জরুরি। তার মতে, মায়ের টিকা ও শিশুর সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সানা/আপ্র/২৩/৫/২০২৬