নেপাল ও চীনের হিমালয় সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পর্যন্ত দুই দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৬ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, দেশটির উত্তরের বাগমতী প্রদেশে বুধবারের (২৬ আগস্ট) ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৮১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। একই দুর্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিব্বতের শিগাৎসে প্রদেশের গিরং জেলায় ভূমিধসে চীনে আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা ৩৬২ থেকে বেড়ে ৫৮৬ হয়েছে। বন্যাকবলিত নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজের সময় একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের পর প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
নেপালেই নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৭৭ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনকে ধরলে দুই দেশে মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৮২ জনে।
মার্কিন নাগরিক পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন, আইসিইবিরোধী আন্দোলনকারী গ্রেফতার নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে কাজ করা দক্ষিণ কোরিয়ার নয় নাগরিকেরও এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নেপালকে নিজেদের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিদেশি আর্থিক সহায়তাকে স্বাগত জানালেও আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নিচ্ছে না।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে তাদের এ ধরনের সহায়তার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত সহায়তা বা দক্ষতার জন্য বিদেশি সহযোগিতা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে নেপালের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলে শতাধিক মানুষ আটকা পড়েছেন। প্রকল্পটির একটি বন্যাকবলিত সুড়ঙ্গে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে নেপালের সেনাবাহিনী। কাদার পুরু স্তরে পুরো এলাকা ঢেকে যাওয়ায় সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও প্রায় ৩৫০ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভেতরে আটকে থাকা আরো প্রায় ১০০ জনকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে।
নেপালের উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তারা ৩ হাজার ৭৪২ জনকে উদ্ধার করেছেন, যাদের মধ্যে ১২১ জন বিদেশি নাগরিক। এ ছাড়া হেলিকপ্টারে আরো ৩ হাজার ২৫৩ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে উদ্ধারকাজের মাঝেই নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ জমে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে যে হ্রদ তৈরি হয়েছিল, সেটি উপচে পড়েছে। দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কায় নেপাল ও চীনের কিছু এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের নেপাল প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার জানিয়েছেন, দুর্যোগে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দ্রুত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে এবং নতুন করে বন্যার ঝুঁকি নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে বিশাল হিমবাহ ও পাথরের স্তর ধসে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার প্রশস্ত একটি হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়েছিল। এর আঘাতের শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত লেন্দে নদী থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমে থাকা হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: এনডিটিভি, দ্য হেরাল্ড বিজনেস, দ্য গার্ডিয়ান
এসি/আপ্র/২৯/০৮/২০২৬