গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

মেনু

আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে রহস্য আর প্রশ্ন

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২:১৯ পিএম, ২৮ মে ২০২৬ | আপডেট: ২২:১৬ এএম ২০২৬
আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে রহস্য আর প্রশ্ন
ছবি

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস -ছবি সংগৃহীত

কোরবানির ঈদের আগের দিন রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও শোকের জন্ম দিয়েছে। হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে থাকা এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে উঠেছে অবহেলা, কারিগরি ত্রুটি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনার নানা প্রশ্ন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও কোনো ‘টেকনিক্যাল ফল্টের’ ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন, আলামত সংগ্রহ, মামলা এবং সিআইডির তদন্ত শুরু হয়েছে।

যেভাবে ঘটলো মর্মান্তিক ঘটনা
মঙ্গলবার বুধবার (২৭ মে) দিবাগত রাতে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ১১ প্রসূতি ও তাদের নবজাতক ছিল। এর মধ্যে ছয় নবজাতক মায়ের সঙ্গে ওই ওয়ার্ডে ছিল, বাকি পাঁচটি শিশু আগে থেকেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান জানান, রাত দুইটার দিকে কয়েকজন অভিভাবক শিশুদের ঠান্ডা লাগছে অভিযোগ করে ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বন্ধ করতে বলেন। পরে প্রায় এক ঘণ্টা এসি বন্ধ ছিল। রাত তিনটার দিকে আবার এসি চালু করা হয়।

রাত চারটার দিকে প্রথম একটি শিশু অস্বাভাবিক কান্নাকাটি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে তাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে আবার পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে ভোরের দিকে একে একে সব শিশুর শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক কান্না ও বমিভাব দেখা দেয়। সকাল ছয়টার দিকে প্রথম শিশুটির মৃত্যু হয়। এরপর সকাল নয়টার মধ্যে আরও পাঁচ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে।

‘শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ’ পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ওয়ার্ডটির পরিবেশ ছিল ‘শ্বাসরুদ্ধকর’।

তিনি বলেন, “ওখানে এসি এমনভাবে স্থাপন করা ছিল যে, সেটি বন্ধ হলে ভেন্টিলেশনের আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিস্থিতিতেই আমরা ছয় নবজাতককে হারিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, অসুস্থ হওয়ার পর শিশুদের পাঁচতলার এনআইসিইউতে পাঠানো হলেও পুরো ব্যবস্থাপনায় একটি দুর্বলতা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। সেবাদানে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।

‘চিকিৎসাজনিত নয়, টেকনিক্যাল ফল্ট’ 
অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেন, একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু চিকিৎসাজনিত জটিলতার কারণে হয়েছে বলে মনে হয় না।

তার ভাষ্য, “এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে পরপর ছয়টি শিশু মারা যাওয়া কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। এখানে কোনো একটি কারিগরি ত্রুটির সম্ভাবনা রয়েছে।”

তিনি জানান, সিআইডির কারিগরি বিশেষজ্ঞরা এসি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরীক্ষা করছেন। বিষাক্ত গ্যাস, এসি লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট বিভিন্ন আলামত ও নমুনা সংগ্রহের পর পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডটি সিলগালা করে দেয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সরাসরি অভিযোগ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই ছয়টি প্রাণ ঝরে গেছে।

কিশোরগঞ্জে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এসির সঙ্গে অক্সিজেন সাপোর্টের সংযোগ ছিল। কিন্তু এসি চালু না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয় এবং শিশুদের মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে।”

মন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তারা গভীরভাবে মর্মাহত।

তিনি বলেন, “এত দ্রুত ঘটনাটি ঘটেছে যে আমরা কিছু বোঝার সুযোগ পাইনি। শিশুগুলোকে দ্রুত এনআইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল, ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল, চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।”

এসি লিকেজের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসিগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। তবে কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, আদ-দ্বীন হাসপাতালে ১৯৯৭ সাল থেকে বিপুলসংখ্যক ডেলিভারি হয়েছে, কিন্তু একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তও চলছে। কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

ময়নাতদন্ত নিয়ে দ্বিধা
শিশুগুলোর ময়নাতদন্ত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, আইন অনুযায়ী অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত। তবে অনেক অভিভাবক এত ছোট নবজাতকের মরদেহ কাটাছেঁড়া করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, “ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন। তবে পরিস্থিতিগত আলামত ও প্রযুক্তিগত তদন্তের ভিত্তিতেও আইনি প্রক্রিয়া চলবে।”

মামলা ও তদন্ত শুরু
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। নিহত এক শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত পরিবেশ, এসি বা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটি—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা হবে। কারও গাফিলতি বা অব্যবস্থাপনা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


শোকের ভারে ভেঙে পড়া পরিবারগুলো
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে বুধবার (২৮ মে) সকালজুড়ে ছিল স্বজনদের আহাজারি। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুকা তিন দিন বয়সী মৃত নাতনিকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসেছিলেন। পাশে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন তাঁর পুত্রবধূ মীম।

মাসুকা বলেন, “ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আইছিলাম। হঠাৎ সব বাচ্চা একসঙ্গে কান্দা শুরু করল। পরে নামাজ পড়তে গেছি, তখন ছেলে এসে মৃত্যুর খবর দিল।”

নাজমা বেগম হারিয়েছেন তাঁর যমজ সন্তান। এছাড়া মীম, ফারিহা, জান্নাত ও ফাহিমা নামের আরও চার মা হারিয়েছেন তাঁদের নবজাতক সন্তান।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক স্বজনই অভিযোগ করেন, এটি কেবল দুর্ঘটনা নয়; অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল। কেউ কেউ একে ‘হত্যা’ বলেও আখ্যা দেন।

এখন পুরো দেশের নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে—আসলে কী কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিভে গেল ছয়টি নবজাতকের জীবন।
সানা/আপ্র/২৮/৫/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
২৮ মে ২০২৬

তদন্ত প্রতিবেদন পেলে আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয়জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হ...

হামে মৃত্যুর মিছিলে ঈদের দিনেও চলে গেল পাঁচ শিশু
২৮ মে ২০২৬

হামে মৃত্যুর মিছিলে ঈদের দিনেও চলে গেল পাঁচ শিশু

ঈদের আনন্দের দিনেও থামেনি হামে মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আরো পাঁচজনের ম...

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের অপেক্ষায় আদ্-দ্বীন
২৭ মে ২০২৬

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের অপেক্ষায় আদ্-দ্বীন

রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে এক রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্য...

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রহস্যজনকভাবে ছয় নবজাতকের মৃত্যু
২৭ মে ২০২৬

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রহস্যজনকভাবে ছয় নবজাতকের মৃত্যু

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন কেবিনেটে ছিলেন না আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিচালনায় একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল। তবে তিনি সেই কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না। আপনি কি মনে করেন আসিফ মাহমুদ সঠিক কথ্য বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে