রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে এক রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি তারা। একই সঙ্গে অভিভাবকদের বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকৃত কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অপেক্ষা করতে হবে।
বুধবার (২৭ মে) হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। নিহত শিশুদের পরিবারের ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ১১ জন প্রসূতি চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয় নবজাতক ওই ওয়ার্ডে ছিল, আর বাকি পাঁচ নবজাতক বিভিন্ন কারণে আগে থেকেই নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিল।
ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ভোরের দিকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতকের শ্বাসকষ্টের খবর পাওয়া যায়। সকাল ৬টার দিকে তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হলে দুই শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং বাকি চারজনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ছয় নবজাতকই মারা যায়।
ঘটনার পর অভিভাবকদের পক্ষ থেকে হাসপাতালের অবহেলা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ঘটনাটি খুব দ্রুত ঘটেছে। নবজাতকদের অসুস্থ হওয়ার পরপরই নার্স ও চিকিৎসকেরা তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে শিশুদের তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় অবহেলা বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত চলছে। ফরেনসিক টিমও বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করছে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে ত্রুটি বা গ্যাস নির্গমনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। তবে এ ঘটনায় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা গ্যাস নির্গমন হয়েছিল কি না, তা তদন্তেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরুর পর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে এত নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সংশ্লিষ্ট কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকলে বিকল্প বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে দমবন্ধকর পরিবেশের আলামত পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরে এক লিখিত বিবৃতিতে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৬ মে দিবাগত রাত ২টার দিকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু থাকলেও কয়েকজন নবজাতকের মা সেগুলো বন্ধ করার অনুরোধ জানান। পরে কর্তব্যরত নার্সরা সাময়িকভাবে যন্ত্রগুলো বন্ধ করেন। রাত ৩টার দিকে পুনরায় চালু করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাত ৪টার দিকে একটি নবজাতক অস্বাভাবিকভাবে কান্না শুরু করলে তাকে দ্রুত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অন্য পাঁচ নবজাতককেও সেখানে স্থানান্তর করা হয়। সকাল ৬টায় প্রথম নবজাতকের মৃত্যু হয় এবং সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে আরো পাঁচ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই ওয়ার্ডে রাতের শিফটে তিনজন নার্স দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনার পর হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা হাসপাতালে অবস্থান করে বিষয়টি তদন্ত করছেন।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্তও চালাচ্ছে। তদন্তে কারও গাফিলতি বা ত্রুটি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/২৭/৫/২০২৬