দেশে টিকার ঘাটতি, রোগ বিস্তার ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে বহুবার সতর্ক করার কথা জানিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ। সংস্থাটি বলেছে, নিয়মিত টিকা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, সময়মতো টিকা কেনা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার গুরুত্ব ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতি’ সম্পর্কে গত ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি দেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। ওই চিঠিতে হাম-রুবেলার এমআর৫ টিকার মেয়াদ ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার তথ্য জানানো হয়। পাশাপাশি পোলিওর বিওপিভি, টিটেনাস-ডিপথেরিয়া টিডি এবং যক্ষ্মার বিসিজি টিকার মেয়াদও ফেব্রুয়ারির মধ্যেই শেষ হতে যাচ্ছে বলে সতর্ক করা হয়।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, মজুদ শেষ হয়ে গেলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিস্তার, জটিলতা ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও দাপ্তরিক যোগাযোগও হয়েছিল বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করত সরকার। তবে ২০২৫ সালে এসে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনাকে রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফের ভাষ্য, এই নীতিগত পরিবর্তনের কারণেই টিকা সরবরাহে বিলম্ব তৈরি হয়।
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার অস্থিরতা এবং টিকাদান কর্মসূচিসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘ আন্দোলনের কারণেও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করে। মার্চে রোগী বৃদ্ধির পর টিকাদান কার্যক্রমে দুর্বলতা সামনে আসে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৪৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ দেখছে না।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা কিনতে আট থেকে ১১ মাস পর্যন্ত সময় লাগে, যা সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা অব্যাহত রাখার পক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন।
সংস্থাটি বলেছে, রোগ বিস্তারের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি, যুক্তরাষ্ট্র সরকারসহ অংশীদারদের সহযোগিতায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়। গত ৫ এপ্রিল ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায় জরুরি টিকাদান অভিযান শুরু হয়, যা পরে জাতীয় হাম কর্মসূচিতে সম্প্রসারিত করা হয়। এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এ কর্মসূচি গত ১০ মে প্রায় শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।
ইউনিসেফ আরো জানিয়েছে, বর্তমান সরকার সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ক্রয়প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সানা/আপ্র/১৮/৫/২০২৬