হাওরকন্যা নামে পরিচিত সুনামগঞ্জে বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন আর নেই সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির রোষানলে বিপন্ন দেশের অন্নদাতার স্বপ্ন। যেখানে এই সময় বাতাসের দোলায় দুলতো পাকা ধানের শীষ, সোনালি ধানের আগমনে কৃষকের ঘরে থাকতো উৎসবের আমেজ; সেখানে এখন পানি থই থই করছে। সেই পানির নিচে চাপা পড়ে আছে হাজারো কৃষকের এক বছরের স্বপ্ন, শ্রম আর আশা। প্রকৃতির এই নির্মম রূপ যেন নিঃশব্দে কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন।
ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে যেন বিষাদ সিন্ধু হয়ে গেল সুনামগঞ্জ জেলা। যেখানে দিগন্ত জোড়া ফসলের বাম্পার ফলনে কৃষকের মনে আনন্দ থাকার কথা; সেখানে জেঁকে বসেছে কান্নার রোল। সোনালি ধান ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে ফসলের এই সলিল সমাধি শুধু হাজার হাজার কৃষকের ক্ষতিই নয় বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক অশনিসংকেত।
সুনামগঞ্জে এ বছর ১৩৭টি হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছিল- যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ লাখ টন ধান। কিন্তু প্রকৃতির রোষানলে এরই মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ধান বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এখনো প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে। সুনামগঞ্জে যখন একে একে ভেঙে পড়েছিল দেখার হাওর, করচার হাওর, তাঙ্গায়া, খাই ও পাখিমারা হাওরের বাঁধগুলো; তখন কৃষকের কান্নার আওয়াজ হয়তো মেঘালয়ের পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
কৃষকের জীবন এমনিতেই অনিশ্চয়তায় ভরা। কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো রোগবালাই প্রতিটি দিনই যেন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। কিন্তু হাওরের কৃষকদের জন্য এ দুর্যোগ আরও ভয়াবহ। তারা বছরের অধিকাংশ সময় অপেক্ষা করে একটিমাত্র ফসলের জন্য। ওই এক ফসলই তাদের সংসারের হাসি, কান্না এবং বেঁচে থাকার শক্তি। আর যখন সেই ফসলই পানির নিচে তলিয়ে যায়; তখন শুধু জমিই ডোবে না, ডুবে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।
প্রতি বছরের মতো এবারও অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কৃষকদের জীবন। এই বছরের আকস্মিক বন্যা যেন কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হানা দিয়েছে। ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে হাওরের পানি হু হু করে বেড়ে ওঠে। কৃষকেরা বুঝে ওঠার আগেই সোনালি ধান কালো পানির নিচে হারিয়ে যায়। অনেকেই শেষ চেষ্টা হিসেবে পানিতে নেমে ধান কাটতে চেয়েছেন কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সেই লড়াই ছিল অসম। সেখানে পানিতে ভাসছিলো খাবার কিন্তু খাওয়ার সময় নেই কৃষকদের। পানির গভীরতা, স্রোত আর সময় সবকিছু মিলিয়ে তারা পরাজিত হয়েছেন। এই একটি ফসলই তাদের সবকিছু ছিল। এই ফসলের ওপর নির্ভর করতো সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের খাবার, ঋণ শোধের আশা, এমনকি ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
ফসল হারানোর মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক ভাঙনও। অনেক কৃষক আজ দিশাহারা। কীভাবে নতুন করে শুরু করবেন, সেই পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছেন। একে তো মাথার ওপরে ঋণের বোঝা; তার উপরে খেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। এ দৃশ্য কেবল একটি অঞ্চলের নয়, আমাদের সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শহরে বসে যখন খাবারের থালা সামনে পাই; তখন খুব কমই ভাবি সেই চাল কোথা থেকে আসে, কত কষ্টের বিনিময়ে তা সকলের কাছে পৌঁছায়। সুনামগঞ্জের এই বিপর্যয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, খাদ্যের পেছনে আছে অগণিত মানুষের ঘাম, পরিশ্রম আর ত্যাগ। তবে এই দুর্দশার মাঝেও কিছু প্রশ্ন জাগে। কেন প্রতি বছর এমন দুর্যোগে কৃষকরা এতা অসহায় হয়ে পড়েন, কেন আগাম প্রস্তুতি বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না, বাঁধ ভেঙে যাওয়া, পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কিংবা পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব—এসব বিষয় যেন বারবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
কৃষকরা শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, অব্যবস্থাপনার সঙ্গেও লড়াই করছেন। তাদের এই দুর্দশা লাঘব করতে প্রয়োজন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন হাওরের ক্ষণস্থায়ী বাঁধ বদলে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ।জরুরি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই পরিকল্পনা—এসব এখন সময়ের দাবি। শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ কৃষক বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশ, টিকবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। তবুও এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষক হার মানতে শেখেননি।
হয়তো আবারও পানিতে নামবেন, আবারও শুকাবে জমি। আবারও নতুন করে বীজ বপন করবেন তারা। কারণ আশা হারিয়ে ফেললে কৃষকের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সেই আশাই তাদের বারবার নতুন করে শুরু করার শক্তি জোগায়। সুনামগঞ্জের পানিতে আজ যে স্বপ্নগুলো ডুবে গেছে; সেগুলো কেবল কৃষকের নয়—এটি সবার স্বপ্নের ক্ষতি। এই কান্না, এই বেদনা আমাদেরও অনুভব করা উচিত। কারণ সবাই কোনো না কোনোভাবে এই মাটির সঙ্গে, এই কৃষকের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এক ফসলের সঙ্গে যে হাজারো স্বপ্ন ডুবে গেল, সেই স্বপ্নগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব সবার।
বর্তমানের এই বিপর্যয় যেন শুধু একটি খবর হয়ে না থাকে বরং হয়ে উঠুক পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু কৃষিনির্ভর, তাই কৃষকদের ক্ষতি মানে সবার ক্ষতি, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সুতরাং দেশ ও কৃষকের কল্যাণে এই দুর্যোগে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আজ যদি আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কৃষকদের পাশে দাঁড়াই, তাহলে আমাদের দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে। যা দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে এবং বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সহযোগিতা করবে।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৫.২০২৬