মৃণাল সেনের জন্মবার্ষিকীতে কিংবদন্তি এই নির্মাতাকে নতুনভাবে স্মরণ করলেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। তবে এটি কেবল একজন ভক্তের স্মরণ নয়; বরং এমন এক শিল্পীর অনুভব, যিনি পর্দায় মৃণাল সেন হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার জীবনদর্শন ও ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।
আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চঞ্চল জানান, প্রথমে তিনি মৃণাল সেনকে চিনেছিলেন তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। পরে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘পদাতিক’-এ অভিনয় করতে গিয়ে মানুষ মৃণাল সেনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন।
চঞ্চলের শৈশব কেটেছে এমন এক গ্রামে, যেখানে বিদ্যুৎও ছিল না। ফলে সিনেমার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে অনেক পরে। স্কুলজীবনের শেষ দিকে চলচ্চিত্র দেখা শুরু হলেও কলেজে ওঠার আগেই ভিসিআরে নানা দেশি-বিদেশি ছবি দেখতেন। সেই সময়ই প্রথম পরিচয় ঘটে মৃণাল সেনের সিনেমার সঙ্গে। সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে মৃণালের চলচ্চিত্রের অর্থও তার কাছে নতুনভাবে ধরা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
চঞ্চলের ভাষায়, উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক—এই তিন নির্মাতাই সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
তবে মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে শুরুতে রাজি হননি চঞ্চল। পরিচালক সৃজিত মুখার্জীর কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর তার মনে হয়েছিল, এমন একজন কিংবদন্তিকে ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। শুধু চেহারার মিল নয়, একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, চোখের ভাষা, চলাফেরা ও জীবনদর্শন তুলে ধরাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চরিত্রটির প্রস্তুতির জন্য তিনি নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেন মৃণাল সেনের জগতে। পড়েন নানা বই, দেখেন পুরোনো সাক্ষাৎকার ও ভিডিওচিত্র। পাশাপাশি আবারও দেখেন মৃণাল সেন নির্মিত প্রায় সব চলচ্চিত্র। চঞ্চলের মতে, মৃণালকে সবচেয়ে বেশি জানা যায় তার সিনেমার ভেতর দিয়েই। কারণ নিজের জীবন, বিশ্বাস, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অবস্থান তিনি চলচ্চিত্রের মধ্যেই তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষ, অবহেলিত শ্রেণি, শহর-গ্রামের বৈষম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের প্রধান সুর। আর এই বিষয়গুলোই তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
চঞ্চলের কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মৃণাল সেনের আপসহীন জীবনবোধ। তার ভাষায়, খ্যাতি বা জনপ্রিয়তার জন্য কখনও নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি এই নির্মাতা। আর্থিক সংকট, বাধা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের নীতি আঁকড়ে ছিলেন। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটিকে বড় শিক্ষা বলেও মনে করেন চঞ্চল।
এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় ব্যক্তিজীবনেও কঠিন সময় পার করছিলেন তিনি। শুটিং শুরুর কিছুদিন আগেই মারা যান তার বাবা। সেই শোক নিয়েই তাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়। চঞ্চল জানান, তার বাবার তরুণ বয়সের চেহারার সঙ্গে মৃণাল সেনের কিছুটা মিল ছিল। ফলে মেকআপ নেওয়ার পর আয়নায় নিজেকে দেখলে অনেক সময় বাবার মুখই দেখতে পেতেন তিনি।
তার ভাষায়, মৃণাল সেনের চরিত্রে ঢুকে গেলে কিছু সময়ের জন্য বাবাকে হারানোর শোক ভুলে থাকতে পারতেন। কিন্তু মেকআপ তুলে ফেললেই আবার ফিরে আসত সেই শূন্যতা। এই আবেগই তাকে চরিত্রটির আরও গভীরে নিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর মৃণাল সেনের ছেলে কুণাল সেনের সঙ্গে দেখা হলে চঞ্চল জানতে চান, অভিনয়ের মধ্যে তিনি বাবার ছায়া খুঁজে পেয়েছেন কি না। উত্তরে কুণাল সেন বলেন, একাধিক মুহূর্তে তার মনে হয়েছে, যেন তিনি নিজের বাবাকেই দেখছেন। এই মন্তব্যকেই চঞ্চল তার অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি বলে মনে করেন।
চঞ্চলের মতে, বর্তমান সময়ে মৃণাল সেনের মতো স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সহজ নয়। এখন অনেক নির্মাতাই নানা জটিলতার আশঙ্কায় রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে চলেন। অথচ মৃণাল সেন নির্ভয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। তার চলচ্চিত্র ছিল কেবল বিনোদন নয়, সামাজিক বিবেকেরও ভাষা।
চঞ্চলের কাছে মৃণাল সেন শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; তিনি এক ধরনের নৈতিক অবস্থানের প্রতীক। তার বিশ্বাস, এই চরিত্রে অভিনয় ছিল এক শিল্পীর ভেতর দিয়ে আরেক শিল্পীকে আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা, যা তাকে নিজের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে।
সানা/আপ্র/১৫/৫/২০২৬