সাতক্ষীরা সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বেত্রাবতী নদীর তীরঘেঁষা শান্ত গ্রাম মুরারিকাটি বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার এলেই রূপ নেয় প্রাণের উৎসবে। শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী চার দিনব্যাপী ‘তাল মেলা’ ঘিরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আজ শুক্রবার (১৫ মে) শেষ হচ্ছে এবারের আয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পূর্বপুরুষদের সময় থেকে বৈশাখের শেষ মঙ্গলবারকে কেন্দ্র করে জেলেপাড়ায় এই বিশেষ পূজা ও উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে। সারা বছরের ক্লান্তি ভুলে এ সময় আনন্দে মেতে ওঠেন এলাকাবাসী। শুধু কলারোয়া নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও হাজারো মানুষ ভিড় করেন এই লোকজ উৎসবে।
মেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভ কুমার মন্ডল জানান, প্রতি বছর কালীপূজার মধ্য দিয়ে মেলার সূচনা হয়। এরপর চার দিন ধরে চলে ধর্মীয় যাত্রাপালা, কবিগান, আবৃত্তি ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় শ্রী শ্রী শীতলা পূজা। দেবীর বিদায় ও বিসর্জন উপলক্ষে সেদিন সিঁদুর খেলাসহ নানা ঐতিহ্যবাহী আচার পালিত হয়। ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় প্রায় শত মণ বাতাসা ও সন্দেশ।
কমিটির সভাপতি নির্মল মন্ডল বলেন, উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুরো আয়োজনজুড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে।
ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই মেলা এখন পরিণত হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায়। মেলার অধিকাংশ দোকান পরিচালনা করেন মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা। ফলে এটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের আয়োজন নয়, বরং সবার অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা সম্মিলিত উৎসব।
মেলার মাঠজুড়ে থাকে উপচে পড়া ভিড়। আশপাশের বাড়িগুলোতেও নেমে আসে উৎসবের আমেজ। দূরদূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনরাও এ সময় গ্রামে ফিরে আসেন। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে এই মেলা যেন স্বস্তি ও আনন্দের এক আশ্রয় হয়ে ওঠে।
আধুনিক বিনোদনের যুগেও মুরারিকাটির তাল মেলা ধরে রেখেছে তার লোকজ বৈশিষ্ট্য। শিশুদের জন্য থাকে কাঠের রাইডার, কাপড়ের তৈরি মঞ্চ, মাটির ঘোড়া-হাতি, বাঁশি, বায়োস্কোপ ও ছোটখাটো জাদুর আয়োজন। এসব ঘিরে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা যায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে।
রাত নামলে মেলার পরিবেশে আসে ভিন্ন আবহ। নির্দিষ্ট স্থানে অনুষ্ঠিত হয় যাত্রাপালা। হারমোনিয়াম ও তবলার সুরে লোককাহিনি, বীরত্ব, ভক্তি ও সাম্যের গল্প উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা।
মেলায় আসা বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষের ভাষ্য, এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। মুসলমান বন্ধুরা যেমন হিন্দুদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে যান, তেমনি হিন্দুরাও অংশ নেন মুসলমানদের বিভিন্ন আয়োজনে। তাদের মতে, এই মেলার মাঠ যেন শান্তি ও সম্প্রীতির এক ছোট্ট প্রতীক।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, মুরারিকাটির এই তাল মেলা শুধু কেনাকাটা বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও শেকড়ের স্মৃতিকে ধরে রাখার এক জীবন্ত মাধ্যম। যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যের মধ্যেও এই উৎসব আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—সম্প্রীতিই বাংলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সানা/আপ্র/১৫/৫/২০২৬