গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মেনু

শিক্ষকের জীবনেও থাকুক স্বাভাবিকতার স্বাধীনতা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:১৪ পিএম, ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩৯ এএম ২০২৬
শিক্ষকের জীবনেও থাকুক স্বাভাবিকতার স্বাধীনতা
ছবি

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল -ছবি সংগৃহীত

একজন শিক্ষক কি শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে দাঁড়িয়ে পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত পাঠ শেষ করে দেওয়া একজন মানুষ? নাকি তিনি এমন এক মানবিক সত্তা, যাঁর রয়েছে অনুভূতি, আনন্দ, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং জীবনকে স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করার অধিকার? সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালকে ঘিরে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক আলোচনা আমাদের সামনে এই মৌলিক প্রশ্নটিই নতুন করে হাজির করেছে।

একটি ছোট ভিডিও, একটি পরিচিত গান এবং একজন শিক্ষকের স্বাভাবিক উপস্থিতি-এত সামান্য একটি বিষয় কীভাবে সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, তা আমাদের সমাজের মানসিকতা ও মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো শিক্ষককে এমন এক কৃত্রিম গাম্ভীর্যের আবরণে আবদ্ধ করে রাখতে চাই, যেখানে তাঁর হাসি থাকবে না, আনন্দ থাকবে না, সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর কোনো নিবিড় সম্পর্ক থাকবে না? নাকি আমরা এমন একটি মানবিক সমাজ নির্মাণ করতে চাই, যেখানে একজন শিক্ষক তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবেও স্বীকৃতি পাবেন?

শিক্ষকের কাছে সমাজের প্রত্যাশা অবশ্যই থাকবে। কারণ একজন শিক্ষকই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁর আচরণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু দায়িত্বশীলতা কখনোই ব্যক্তিসত্তার বিলোপ নয়। বরং একজন প্রাণবন্ত, সংস্কৃতিমনা ও মানবিক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সামনে সবচেয়ে ইতিবাচক আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন।

আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলে, শিশুর শেখার ক্ষমতা শুধু মুখস্থনির্ভর পাঠে বিকশিত হয় না। শেখার আনন্দ, অনুসন্ধিৎসা, সৃজনশীল অংশগ্রহণ এবং মুক্ত চিন্তার সুযোগই একটি শিশুর মেধা ও মননের পূর্ণ বিকাশের প্রধান ভিত্তি। একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণ, মানবিকতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে ওঠে তখনই, যখন শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

যে শিক্ষাব্যবস্থায় গান, কবিতা, গল্প, নাটক, শিল্পচর্চা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় থাকে, সেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলাফলের জন্য প্রস্তুত হয় না; তারা জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্য ধারণের প্রক্রিয়া নয়, এটি মানুষ হয়ে ওঠার এক দীর্ঘ যাত্রা।

যে শিক্ষক নিজে গান ভালোবাসেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করেন, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার বীজ বপন করতে পারেন। শিশুরা শুধু বই পড়ে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের আচরণ, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন থেকেও।

মানুষের সমাজ কোনো অনুভূতিহীন যান্ত্রিক কাঠামো নয়। এটি গড়ে ওঠে হাসি-কান্না, উৎসব, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, খেলাধুলা, গান, কবিতা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার সমন্বয়ে। এই মানবিক উপাদানগুলো বাদ দিয়ে একটি প্রজন্মকে শুধু তথ্যের ভারে বড় করলে হয়তো অনেক পরীক্ষার্থী তৈরি হবে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ তৈরি হবে না।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে আনন্দের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশু ভয়, সংকোচ ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বেড়ে ওঠে, তার আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিপরীতে যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায় এবং সৃজনশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সে ভবিষ্যতে সাহসী, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।

এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারও কোনো কর্মকাণ্ড পছন্দ না হলে যুক্তির মাধ্যমে মত প্রকাশ করা যেতে পারে। কিন্তু অপমান, বিদ্রূপ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় নয়। ভিন্ন মতকে সম্মান করা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাই একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য।

বিউটি রাণী পালের ভিডিও তাই এখন আর শুধু একটি ভিডিও নয়; এটি আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ তাঁকে মানবিক অনুভূতিহীন কোনো প্রতিমূর্তি বানিয়ে ফেলা নয়। বরং তাঁর মানবিক সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েই তাঁর মর্যাদা আরো উচ্চতর করা যায়।

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো-শত প্রশ্ন, সমালোচনা ও বিতর্কের মাঝেও একটি বড় ধরনের সামাজিক জাগরণ আমাদের গভীরভাবে আশান্বিত করেছে। বিউটি রাণী পালের একটি সাধারণ ভিডিওকে ঘিরে যে প্রশ্নের সূত্রপাত হয়েছিল, তার শেষ অধ্যায়টি পরিণত হয়েছে এক মানবিক প্রতিবাদের অনন্য উদাহরণে। একজন শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকরা, শিল্পীরা, কবি-সাহিত্যিকরা, সাংবাদিকরা এবং সমাজের সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষ।

এই সংহতি শুধু একজন শিক্ষিকার প্রতি সমর্থন নয়; এটি একটি বৃহত্তর মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। এটি প্রমাণ করে, সব বিভ্রান্তি ও সংকীর্ণতার মধ্যেও সমাজের বিবেক এখনো জাগ্রত আছে। মানুষ এখনো বুঝতে পারে কোন পথে এগোলে একটি উদার, সংস্কৃতিমনা ও আলোকিত সমাজ নির্মাণ সম্ভব।

একটি সুস্থ সমাজ কখনো শুধু নিষেধের দেয়াল তুলে এগিয়ে যেতে পারে না। তাকে এগোতে হয় সহমর্মিতা, যুক্তি, সংস্কৃতি ও মানবিকতার আলোয়। বিউটি রাণী পালের ঘটনাকে ঘিরে যে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে-সমাজ এখনো ভালোকে চিনতে জানে, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে জানে এবং আলোকিত পথের সন্ধান করতে ভুলে যায়নি।

শিক্ষকের জীবনেও থাকুক স্বাভাবিকতার স্বাধীনতা। কারণ একজন আনন্দময়, সংস্কৃতিমনা ও মানবিক শিক্ষকই পারেন একটি সাহসী, সৃজনশীল এবং আলোকিত প্রজন্ম তৈরি করতে। শিক্ষা যদি জীবনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা কেবল তথ্যের বোঝা হয়ে থাকে। আর জীবনঘনিষ্ঠ, আনন্দময় ও মানবিক শিক্ষা থেকেই জন্ম নেয় বিবেকবান, সাহসী ও প্রকৃত মানুষ।
সানা/আপ্র/২৯/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
২৮ জুলাই ২০২৬

টুথপেস্টেও বিষের ছোবল, এখনই চাই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

মানুষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যে কাজটি সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে করে,...

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না
২৭ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নামে ঢাকার অস্তিত্ব বিপন্ন করা যাবে না

রাজধানী ঢাকা আজ এক গভীর নগর সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, জল...

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব
২৬ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত বাস্...

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই
২৫ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তায় আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শিল্পী বললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ এখন প্রতিবাদের ভাষা

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে গানটি সিলেটের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া সমালোচনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শিক্ষকদের সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। গানটির গায়ক মেজবাহ রহমান বলেন, “আমাদের এই গানটি যে অন্যায্য সমালোচনার বিরুদ্ধে একটি বড় সামাজিক আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। গানটি মূলত প্রকৃতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এখন এটি অনেকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন গানটি সত্যিই প্রতিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 18 ঘন্টা আগে