দেশের জ্বালানি খাত আজ এক জটিল দ্বৈত সংকটে দাঁড়িয়ে- একদিকে অসাধু মজুতদার ও কালোবাজারির দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকির চাপ। সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই; সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। কোথাও কোথাও পাম্পে দীর্ঘ লাইন, দ্রুত তেল ফুরিয়ে যাওয়া এবং বাজারে অস্থিরতা- এসবই প্রমাণ করে পরিস্থিতি কেবল সরবরাহের নয়; ব্যবস্থাপনারও সংকট। প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সরকার যে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখছে, তা নিঃসন্দেহে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু এই নীতি কতদিন বহন করা সম্ভব? রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ভর্তুকি দেওয়া হলে তা আর্থিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে।
ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থির; যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। তখন এই ভর্তুকির বোঝা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে-প্রয়োজনে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু শুধু আশ্বাস দিয়ে বাস্তবতা বদলানো যায় না। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা যখন অনিশ্চয়তায় ভরা, তখন বিকল্প উৎস, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং কৌশলগত মজুত- এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা অপরিহার্য। প্রশ্ন হলো, সেই প্রস্তুতি কতটা দৃশ্যমান? এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে অসাধু বণিকদের অপতৎপরতা।
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল মজুত করা এবং বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ এখন প্রকাশ্য। এমনকি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেও এই অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে খোদ অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন। এই বাস্তবতায় কিছু এলাকায় জ্বালানি পাম্পে সীমান্তরক্ষী বাহিনী মোতায়েন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটি সাময়িক সমাধান মাত্র। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, কঠোর এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আসে। একই সঙ্গে জনগণের আচরণও বিবেচনায় নিতে হবে।
আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর যোগাযোগ কৌশল জরুরি, যাতে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আস্থা পায় এবং অযৌক্তিক মজুত থেকে বিরত থাকে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী? শুধু ভর্তুকি দিয়ে কিংবা প্রশাসনিক কঠোরতা দেখিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন, এবং পরিকল্পিত সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ- এসবই এখন সময়ের দাবি; বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর না হলে ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। জ্বালানি খাতের এই সংকট কেবল একটি খাতের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
জ্বালানির দাম বাড়লে তার অভিঘাত পড়ে প্রতিটি পণ্যে, প্রতিটি সেবায়। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। তাই এখন সময় সাহসী ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মজুতদারদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, ভর্তুকি নীতির পুনর্বিবেচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল-এই তিনটি ক্ষেত্রেই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যৎ সংকট শুধু গভীরই হবে না, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করবে।
সানা/এসি/আপ্র/২৯/০৩/২০২৬